• ruralinfobd.com
  • ruralinfobd.com
  • ruralinfobd.com
  • ruralinfobd.com

a project of...

Win Incorporate

House# 2/6, Block C (4th floor), Lalmatia, Mohammadpur,
Dhaka 1209, Bangladesh

+88 01720 096 123

Results 1 - 5 of 158

কৃষি বিষয়ক তথ্য/ফল জাতীয় ফসল
পরিচিতি বাংলাদেশে কলা অন্যতম প্রধান ফল। অন্যান্য ফলের তুলনায় এটি সস্তা এবং সারাবছর ধরেই পাওয়া যায়। কাঁচা এবং পাকা কলায় আমিষ, শর্করা, চর্বি, খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম, লৌহ উপাদান, ভিটামিন-সি এবং পর্যাপ্ত খাদ্যশক্তি রয়েছে। কলার বহুমুখী ব্যবহার আছে। খাদ্য, ফল, পথ্য, ওষুধ, জ্বালানি, গো-খাদ্য ইত্যাদি হিসাবে কলার ব্যবহার সর্বজন স্বীকৃত। এত বহুল প্রচলিত-পর্যাপ্ত-কমদামি ফল দ্বিতীয়টি আর নেই। কলার ইংরেজি নাম Banana এবং বৈজ্ঞানিক নাম Musa acuminate. পুষ্টিমাণ খাবার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম কলার পুষ্টিমাণ নিম্নে দেওয়া হলো- উপাদান পরিমাণ জলীয় অংশ ৬২.৭ গ্রাম খনিজ পদার্থ ০.৯ গ্রাম আঁশ ০.৪ গ্রাম খাদ্যশক্তি ১০৯ কিলোক্যালরী আমিষ ০.৭ গ্রাম চর্বি ০.৮ গ্রাম শর্করা ২৫.০ গ্রাম ক্যালসিয়াম ১৩ মিলিগ্রাম লৌহ ০.৯ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন ০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি-১ ০.১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ২৪ মিলিগ্রাম সূত্র : পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ওষুধিগুণ কলা অনন্তকাল থেকে রোগীর পথ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাকা কলা কোষ্ঠকাঠিন্যতা দূরীকরণে ব্যবহার করা হয়। কলার থোড়/মোচা এবং শিকড় ডায়াবেটিস, আমাশয়, আলসার, পেটের পীড়া নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। যে সব জায়গায় বেশি পরিমাণে চাষ হয় আমাদের দেশে বর্তমানে বরিশাল, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, রাঙ্গামাটি প্রভৃতি জেলায় ব্যাপকহারে কলার চাষ হচ্ছে। জাত ১. বারি কলা-১ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার : পাকা কলা হিসাবে। রং : পাকা ফলের রং উজ্জ্বল হলুদ। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১১ থেকে ১২ মাসের মধ্যে। আকৃতি : লম্বা, অমৃতসাগরের অনুরুপ। শাঁসর গুণাগুণ : পাকা শাঁস মিষ্টি ও সুস্বাদু। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ১৫০ থেকে ২০০টি। কাঁদির ওজন : ২৫ কেজি। ফলন ক্ষমতা : অমৃতসাগর জাতের চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি। ২. বারি কলা-২ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার : তরকারী কলা হিসাবে। রং : পুষ্ট ফলের রং গাঢ় সবুজ। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১১ থেকে ১২ মাসের মধ্যে। আকৃতি : মাঝারি আকারের। শাঁসের গুণাগুণ : পুষ্ট ফল সহজে সিদ্ধ হয় এবং খেতে ও সুস্বাদু। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ৯৯টি। কাঁদির ওজন : ১৫ কেজি। ফলন ক্ষমতা : ফলন দেশী জাতের কাঁচকলা থেকে বেশি। ৩. বারি কলা-৩ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার : পাকা কলা হিসাবে। রং : পাকা ফলের রং উজ্জ্বল হলুদ। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১২ থেকে ১৩ মাসের মধ্যে। আকৃতি : মাঝারি আকারের। শাঁসের গুণাগুণ : পাকা শাঁস মিষ্টি ও সুস্বাদু। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ১৪১টি। কাঁদির ওজন : ২৩ কেজি। ফলন ক্ষমতা : উচ্চ ফলনশীল। ৪. অমৃতসাগর এ জাতটি বর্তমানে বাণিজ্যিক জাত হিসেবে নরসিংদী, রায়পুরা, শিবপুর, কালিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, মেহেরপুর, বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী প্রভৃতি স্থানে চাষ করা হচ্ছে। বৈশিষ্ট্য চারা : প্রতি গাছ থেকে ১০ থেকে ১৫টি চারা উৎপন্ন হয়। রং : পাকলে খোসা উজ্জ্বল হলুদ রং ধারণ করে। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১১ থেকে ১২ মাসের মধ্যে। আকৃতি : কলা আকারে বেশ বড়, সামান্য বক্রাকৃতি ও লম্বাটে। শাঁসের গুণাগুণ : শাঁস বীজশূন্য, বেশ মোলায়েম, মিষ্টি স্বাদের সুগন্ধযুক্ত ও উজ্জ্বল মাখন রং। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ৬০ থেকে ৯০টি। কাঁদির ওজন : ১৫ কেজি। ফানা ও কলার সংখ্যা : প্রতি কাঁদিতে ৫ থেকে ৭টি ফানা এবং প্রতি ফানায় ১২ থেকে ১৬টি কলা। ৫. সবরি বর্তমানে যশোর, বগুড়া, পাবনা, ঝিনাইদহ, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল, কুষ্টিয়া প্রভৃতি এলাকায় এর চাষ হচ্ছে। বৈশিষ্ট্য রং : পাকলে উজ্জ্বল হলুদ রং ধারণ করে। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যে। আকৃতি : কলা বীজশূন্য, আকারে খাটো ও খোসা খুব পাতলা। শাঁসের গুণাগুণ : কলার শাঁস নরম, ভালোভাবে পাকা কলার শাঁস সুগন্ধযুক্ত মিষ্টি স্বাদের। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ৮৫ থেকে ১২০টি। কাঁদির ওজন : ১০ কেজি। ফানা ও কলার সংখ্যা : প্রতি কাঁদিতে ৬ থেকে ৯টি ফানা এবং প্রতি ফানায় ১২ থেকে ১৫টি কলা। ৬. মেহেরসাগর বর্তমানে মেহেরপুর ছাড়াও রংপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলে এ জাতের চাষ হচ্ছে। বৈশিষ্ট্য রং : কলার রং হালকা হলুদ। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে। আকৃতি : গাছ বামন আকৃতির, তবে কিছুটা লম্বা ও মোটা, কিন্তু অমৃতসাগর অপেক্ষা খাটো। শাঁসের গুণাগুণ : শাঁস সুস্বাদু ও মিষ্টি, কিন্তু বেশি নরম। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ৮৫ থেকে ১২০টি। কাঁদির ওজন : ২৩ কেজি। ফানা ও কলার সংখ্যা : প্রতি কাঁদিতে ১০ থেকে ১১টি ফানা এবং প্রতি ফানায় ১৪ থেকে ২০টি কলা। ৭. বসরাই বর্তমানে মেহেরপুর ছাড়াও রংপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলে এ জাতের চাষ হচ্ছে। বৈশিষ্ট্য রং : পাকা কলার রং ঈষৎ সবুজ। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে। আকৃতি : গাছ বামন আকারের, মোটা শক্ত। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ১৫০ থেকে ২৫০টি। কাঁদির ওজন : ২১ কেজি। ৮. চাঁপা ও চিনি চাঁপা বর্তমানে এ জাতটি নরসিংদী, সিলেট, বগুড়া চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলিতে প্রচুর পরিমাণে আবাদ হচ্ছে। বৈশিষ্ট্য ফলের আকার ও রং : ফল আকারে ছোট (৭.৫ থেকে ১২.০ সেমি লম্বা), প্রায় বীজশূন্য ও পাতলা খোসা বিশিষ্ট হলুদ বর্ণের। আকার : চাঁপা ও চিনি চাঁপা কলার গাছ আকারে প্রায় একই ধরনের। শাঁসের গুণাগুণ : শাঁস আঠালো, লালচে সাদা রঙের, টকযুক্ত মিষ্টি স্বাদের এবং আকর্ষণীয় সুগন্ধ সম্পন্ন। কাঁদির ওজন : প্রতি কাঁদি চাঁপার গড় ওজন ১০ থেকে ১২ কেজি এবং চিনি চাঁপার ওজন ৮ থেকে ১০ কেজি। কলার সংখ্যা : প্রতি কাঁদিতে গড়ে ১৫০ থেকে ২৫০টি কলা। ৯. কবরি কবরি কলা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলিতে বাংলা কলা, সিলেটে শাইল, বরিশালে ও খুলনায় থুতি এবং রংপুরে মানুয়া নামে পরিচিত। বৈশিষ্ট্য রং : পাকা কলার খোসা ধূসর বর্ণের। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে। আকার : এ জাতের কলা আকারে অমৃতসাগর ও সবরি কলা থেকে ছোট, কিন্তু চাঁপা কলা থেকে কিছুটা বড়। শাঁসের গুণাগুণ : শাঁস আঠালো, খুব মিষ্টি এবং ২ থেকে ৪টি বীজযুক্ত। কলার সংখ্যা : কাঁদি প্রতি ৮০ থেকে ১৫০টি। কাঁদির ওজন : ১৩ থেকে ১৪ কেজি। ১০. গেনাসুন্দরী গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা এলাকায় এজাতের কলা সচরাচর দেখা যায়। বৈশিষ্ট্য রং : কলার রং হালকা হলুদ। আকার : গেনাসুন্দরী কলা দেখতে অনেকটা কবরি কলার মতই, তবে আকৃতিতে একটু বড়। শাঁসের গুণাগুণ : শাঁস নরম, মিষ্টিস্বাদের ও অল্প বীজযুক্ত। কাঁদির ওজন : ২০ কেজি। ১১. অগ্নিশ্বর বৈশিষ্ট্য উচ্চতা : গাছ নরম ও লম্বায় ৩ মিটার বা ১০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। রং : কলার রং লাল। আকার : কলার আকার মাঝরি। শাঁসের গুণাগুণ : শাঁস বীজশূন্য ও আঠালো এবং স্বাদে-গন্ধে তেমন আকর্ষণীয় নয়। মিষ্টিস্বাদের ও অল্প বীজযুক্ত। কলার সংখ্যা : প্রতি কাঁদিতে মাত্র ৩০ থেকে ৫৫ টি কলা। কাঁদির ওজন : ৭ থেকে ৮ কেজি। ১২. দুধসাগর বৈশিষ্ট্য রং : পাকা কলার রং দুধের মত সাদা। আকার : কলা ছোট আকারের ও মধ্যম মিষ্টি স্বাদের। সংগ্রহের সময় : রোপণের ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যে। বীজের সংখ্যা : ফলের ভিতর ৫ থেকে ৭ টি বীজ থাকে। ১৩. বিচিকলা বৈশিষ্ট্য রং : পাকার পর খোসা হালকা হলুদ, হলুদ বা লালচে হলুদ রং ধারণ করে। ফল সংগ্রহ : বিচিকলার ঝাড়গুলি ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যনত্ম যত্ন ছাড়াই ফল দিয়ে থাকে। কলার সংখ্যা : প্রতি কাঁদিতে ৬০ থেকে ১২০টি কলা থাকে। কাঁদির ওজন : ১০ থেকে ১২ কেজি। ১৪. কাঁচকলা বা আনাজি কলা বৈশিষ্ট্য উচ্চতা : কাঁচকলার গাছ লম্বায় (২.৫ থেকে ৩.০ মিটার)। ফলের ধরন : পাকলে এ কলা কিছুটা ফাঁপা ধরনের ও খেতে মিষ্টি হয় না। কাঁদির ওজন : ১১ থেকে ১২ কেজি। চাষের সুবিধা • বাড়ির আঙ্গিনা, পতিত জমি বা যেখানে কোন ফসল হয় না সেখানে কলা চাষ করা যায়। • কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমে রোপণ করা যায়। যেমন-মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ, মধ্য মার্চ থেকে মে এবং মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য নভেম্বর। • কলার চারা রোপণের ১১ থেকে ১৩ মাসের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করা যায়। • কলার সাথে আন্তঃফসল হিসেবে শীতকালীন শাকসবজি, পেঁয়াজ, আলু, ধনিয়া, সরিষা ইত্যাদি চাষ করা যায়। • বিভিন্ন ফলের যেমন আম, কাঁঠাল, নারিকেল ইত্যাদি বাগানে প্রথমে কয়েক বছর আন্তঃফসল হিসেবে কলা চাষ করা যায়। স্থান নির্বাচন/চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি/জমি তৈরি স্থান নির্বাচন প্রচুর রৌদ্রযুক্ত, পানি সেচ ও পানি বের করে দেওয়ার সুব্যবস্থা সম্পন্ন উঁচু উর্বর জমি কলা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি জলবায়ু তাপমাত্রা মাটির প্রকৃতি কলা আর্দ্র ও উষ্ণ মন্ডলীয় ফসল। উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী তাপমাত্রা ১৫ থেকে ৩৫ ডিগ্রী সে.। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই কলার চাষ করা যায়। তবে পানি সেচ ও পানি বের করার ব্যবস্থাযুক্ত উঁচু, উর্বর দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ মাটি কলা চাষের জন্য উপযুক্ত। জমি তৈরি কলা গাছ অগভীরমূলী তাই এর শিকড় যাতে মাটিতে ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেজন্য ২ থেকে ৩ বার গভীর করে চাষ দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। রোপণ পদ্ধতি গর্ত তৈরি • জমি তৈরির পর ষড়ভূজী অথবা বর্গাকার রোপণ প্রণালী অনুসরণ করে গর্ত তৈরি করতে হবে। • চারা রোপণের ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই গর্ত তৈরি করতে হবে। • গর্ত তৈরির সময় গর্তের উপরের অংশের মাটি গর্তের নীচে ও নীচের অংশের মাটি গর্তের উপরে দিতে হবে। উপরের মাটির গঠন ও পুষ্টি নীচের মাটির চেয়ে উন্নত হওয়ায় চারার প্রাথমিক বৃদ্ধি ভালো হবে। • তারপর গর্তে পরিমাণ মতো গোবর ও রাসায়নিক সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত বন্ধ করে রাখতে হবে। চারা নির্বাচন অসি চারা পানি চারা কলার চারা বা সাকার দু’রকমের। অসি চারা ও পানি চারা। অসি চারার পাতা ছোট চিকন, গোড়ার দিক মোটা ও সবল। পানি চারার পাতা চওড়া, কান্ড চিকন ও দুর্বল। দু’ধরনের চারার মধ্যে অসি চারা লাগানোই ভালো। চারা উৎপাদন ১. কলাগাছের গোড়া থেকে নতুন সাকার বা চারা বের হয়ে থাকে। একটি ভালো, সুষ্ঠু ও সতেজ চারা রেখে বাকিগুলো গোড়া হতে কেটে ফেলতে হবে। ২. সাধারণত: ১ মাস পরপর এসব চারা কাটা দরকার। চারা রোপণের সময় ও উৎপাদনের ধাপসমূহ মাদা বা গর্তের আকার চারা রোপণের আগে ৫০ সেমি বা ২০ ইঞ্চি চওড়া এবং ৫০ সেমি বা ২০ ইঞ্চি গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। চারার দূরত্ব এক মাদা থেকে অপর মাদা বা এক চারা থেকে অপর চারার দূরত্ব রাখতে হবে ২.০ থেকে ২.৫ মিটার বা ৬ থেকে ৮ ফুট। কন্দের আকার সাধারণত: বেটে জাতের গাছের ৩৫ থেকে ৪৫ সেমি এবং লম্বা জাতের ৫০ থেকে ৬০ সেমি দৈর্ঘ্যের ও ১.৫ কেজি ওজনের কন্দ হলে ভালো। জমিতে কত দিনের চারা লাগাতে হবে রোগমুক্ত বাগান থেকে সংগৃহীত তিন মাস বয়স্ক সুস্থ সবল চারা। চারা বের হবার সময় রোপণের ৪ থেকে ৫ মাস পর থেকে। একটি কলাগাছে কতটি চারা হয় ৫ থেকে ২০টি। চারা রোপণ রোপণের সময় ফল পাওয়ার সময় ফলনের পরিমাণ বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাস চারা রোপণের সর্বোত্তম সময়। ১১ থেকে ১৩ মাস। সবচেয়ে বেশি। চারা রোপণের দ্বিতীয় সর্বোত্তম সময় হলো মাঘ মাস। এ সময় চারা রোপণের জন্য পানি সেচের ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। ১০ থেকে ১২ মাস। তুলনামূলকভাবে কম। তৃতীয় রোপণ সময় হলো বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস। ১১ থেকে ১৬ মাস। ফলন খুবই কম হয়। কলার জাত ও রোপণ দূরত্ব কলার জাত রোপণের দুরত্ব (মিটার) প্রতি হেক্টরে চারার সংখ্যা বর্গাকার ষড়ভুজী অমৃতসাগর ১.৫-২.০ ২৫০০-৪৫০০ ২৯০০-৫২০০ সবরি ১.৮-২.০ ২৫০০-৩১০০ ২৯০০-৩৬০০ চাঁপা ও চিনি চাঁপা ১.৮-২.০ ২৫০০-৩১০০ ২৯০০-৩৬০০ মেহেরসাগর ১.৫-১.৮ ৩১০০-৪৫০০ ৩৬০০-৫২০০ বারি কলা-০১ ১.৫-২.০ ২৫০০-৪৫০০ ২৯০০-৫২০০ বারি কলা-০২ ১.৮-২.৫ ১৬০০-৩১০০ ১৯০০-৩৬০০ কবরি ২.০-২.৫ ১৬০০-২৫০০ ১৯০০-২৯০০ আনাজী কলা ২.০-২.৫ ১৬০০ ২৫০০ ১৯০০-২৯০০ বিচিকলা ২.৫-৩.০ ১২০০-১৬০০ ১৩০০-১৯০০ লক্ষণীয় বিষয় • অনেককে পাতাসহ চারা লাগাতে দেখা যায় কিন্তু তা ঠিক নয়। রোপণের আগে চারার মাথার পুরাতন শিকড় ও গোড়ার শুকনা পাতা কেটে ফেলতে হবে। • গর্তের মাঝখানে চারাটি সোজাভাবে লাগিয়ে তারপর চারদিকে মাটি দিয়ে সামান্য চেপে দিতে হবে। • চারা রোপণের পর গোড়ার মাটি পানি দিয়ে ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। আন্ত:পরিচর্যা সারের মাত্রা ও প্রয়োগ সার মোট পরিমাণ (গাছ প্রতি) গর্ত তৈরির সময় পরবর্তী পরিচর্যার সময় ১ম কিস্তি চারা রোপণের ৩ মাস পর ২য় কিস্তি চারা রোপণের ৫ থেকে ৬ মাস পর গোবর ১ কেজি সব - - ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম - ১০০ গ্রাম ২০০ গ্রাম টিএসপি ১৫০ গ্রাম সব - - এমওপি ২৫০ গ্রাম ১২৫ গ্রাম - ১২৫ গ্রাম জিপসাম ২০০ গ্রাম ১০০ গ্রাম - ১০০ গ্রাম জিংক অক্সাইড ১.৫ গ্রাম সব - - বোরিক এসিড ২.০ গ্রাম সব - - সেচ ব্যবস্থা পানি সেচ ও পানি বের করা সেচের প্রয়োজনীয়তা অতিরিক্ত খরায় কলাগাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফলন কমে যায়। এজন্য চারা রোপণের পরপরই সেচ দিতে হবে। সেচের সময় শুকনো মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ দিন পর পর জমিতে সেচ দেওয়া দরকার। সেচ পদ্ধতি ‘বেড কেলী’ পদ্ধতিতে কলার জমিতে সেচ দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে বেডের দু’ধারে যে নালা তৈরি করা হয় তা দিয়ে কলার বাগানে ভালোভাবে সেচ দেয়া যায়। পানি বের করার ব্যবস্থা বর্ষার সময় বাগানে যাতে পানি জমতে না পারে, তার জন্য নালা করে অতিরিক্ত পানি বের করার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ কলাগাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। গাছের গোড়ায় মাটি • বর্ষাকালে অতিরিক্ত বর্ষণে গাছের গোড়া থেকে মাটি ধূয়ে গিয়ে গোড়ার শিকড় বেরিয়ে পড়ে। তাই সারির দু’পাশে অগভীর নালা করে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হয়। • তাছাড়া গাছের গোড়া উঁচু থাকলে পানি জমে না। সাকার বা চারা ছাঁটাইকরণ চারা ছাঁটাইয়ের প্রয়োজনীয়তা • মাতৃগাছের খাদ্যের অভাব যেনো না হয়। • বাগানে অতিরিক্ত ছায়া পড়ে জমি স্যাঁতস্যাতে না থাকে এবং আলোবাতাসের অভাব না দেখা দেয়। • অধিক ফলন ও উন্নত মানের কলা পাওয়া যায়। চারা ছাঁটাই পদ্ধতি • চারা যখন ১ মিটার লম্বা হয় তখন কেটে বা নষ্ট করে দিতে হবে। • কিন্তু কলাগাছে ফুল আসার সময় মুড়ি ফসলের জন্য একটি সুস্থ সবল চারা রেখে দিতে হবে। • সাধারণত: হাসুয়া দিয়ে মাটির সমতলে চারা কেটে দিতে হবে। তাতে সেই কাটা চারা পুনরায় বড় হতে থাকে এবং বার বার কাটার প্রয়োজন দেখা দেয়। বেড়া নির্মাণ • এ দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই বাড়িতে ছাগল পুষে থাকেন। ছাগল হলো কলা-চারার বড় শত্রু। ছাগল কলাগাছের কচি পাতা খেতে খুব ভালোবাসে। তাই চারা লাগানোর আগেই জমির চারদিকে বেড়া নির্মাণ করা দরকার। অন্তর্বর্তী ফসল কলাবাগানের অন্তর্বর্তী ফসল হিসেবে মূলা, পালংশাক, মরিচ, ছোলা, মসুর, বরবটি, বাঁধাকপি, লালশাক, ডাঁটাশাক এসব ফসলের চাষ করা যায়। আগাছা দমন • বাগানের আগাছা কলাগাছের সাথে খাদ্য ও পানি নিয়ে প্রতিযোগিতা করে থাকে। বাগানের আগাছা দমন না করলে কলার ফলন ৬০ থেকে ৭০% কমে যায়। তাই যথাসম্ভব সব সময় বাগান আগাছামুক্ত রাখতে হবে। • গাছ যখন ছোট থাকে তখন আগাছা দমনে কোদাল বা নিড়ানি ব্যবহার করা যায় কিন্তু গাছ বড় হলে শুধু নিড়ানি ব্যবহার করাই ভালো। কারণ কোদাল ব্যবহার করলে গাছের শিকড় কেটে যেতে পারে। • সাধারণত: সেচের পর মাটির উপরিভাগে একটি শক্ত আবরণ পড়ে। বাতাস চলাচলের সুবিধার্থে মাঝে মাঝে নিড়ানি দিয়ে সেই শক্ত আবরণ ভেঁঙ্গে দিতে হবে। ঠিকা বা খুঁটি দেওয়া এ দেশে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ্য মাসে কালবৈশাখী ঝড় এবং আশ্বিন মাসে নিম্নচাপের দরুন ঝড়বৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই কাঁদির ভারে বা ঝড়-বাতাসে কলাগাছ যাতে পড়ে না যায় সেজন্য কাঁদি বের হওয়ার পরপরই বাঁশের খুঁটি দ্বারা গাছে ঠিকা দিতে হয়। • খুঁটি প্রয়োজনের চেয়ে ২ থেকে ৩ হাত লম্বা রাখলে অথবা খুঁটি আলকাতরা বা রং দিয়ে প্রলেপ দিলে তা ২ থেকে ৩ বছর ব্যবহার করা যেতে পারে। • প্রতিটি কলাগাছে বাঁশের খুঁটি দিতে গেলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়। তাই মাঝে মাঝে প্লাস্টিক বা নারিকেলের রশি ব্যবহার করা যায়। • রশির এক প্রান্ত গাছের কাঁদির নীচে বেঁধে অপর প্রান্ত কাঁদির বিপরীত দিকের আরেকটি গাছের গোড়ায় টান করে বেঁধে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পাতা পরিষ্কার • মাঝে মাঝে গাছের মরা ও শুকনা পাতা পরিষ্কার করতে হবে। তাছাড়া গাছের নীচের দিকের আধা-মরা বা রোগাক্রান্ত পাতা কেটে ফেলতে হবে। কেননা, অনেক সময় এগুলো রোগ-জীবাণু ও পোকা-মাকড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। • কলাগাছের সালোক-সংশ্লেষণের জন্য উপর থেকে ৭ থেকে ৮টি পাতা থাকলেই যথেষ্ট। কাজেই নীচের রোগাক্রান্ত পাতা কাটলে তেমন কোন অসুবিধা হবে না। • গাছে কম পাতা থাকলে বাগানে আলো বাতাস সহজে প্রবেশ করতে পারবে। মোচা অপসারণ • মোচার নীচের দিকে পুরুষ ফুল থাকায় শুধু উপরের ফুলগুলোতেই ফল হয়। তাই মোচা থেকে কলা বের হওয়ার পর শেষের ফানার ৪ থেকে ৫ সেমি নীচে মোচা কেটে দিতে হবে। • মোচা না কাটলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের পোকা-মাকড়ের সমাগম হয়। কাঁদি ঢাকা ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে কলাকে রক্ষা করার জন্য স্বচ্ছ বা নীল পলিথিন ব্যাগ দিয়ে কাঁদি ঢেকে দিতে হবে। তবে পলিথিন ঢাকার আগে মই দিয়ে কয়েকটি ফুটো করে দিতে হবে।   পোকামাকড় ও রোগবালাই পোকামাকড় পোকার নাম লক্ষণ প্রতিকার বিটল পোকা এ পোকার আক্রমণ বর্ষাকালে মুড়ি ফসলে দেখা যায়। মুড়ি ফসলে বেশি হওয়ার কারণ হলো আগের ফসলের পোকা বাগানেই গাছের গোড়ায় ও মরা পাতায় বেঁচে থাকে। সাধারণত: বিটল পোকা কলাগাছের কচি পাতার গোড়ার দিকে থাকে। ১. গাছে কাঁদি আসার আগ পর্যন্ত কচি পাতার গোড়ায় এ পোকা লুকিয়ে থাকে। নগস ভালোভাবে স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়। ২. এ পোকা দমনে সেভিন ১.৫ গ্রাম অথবা ডায়াজিনন ৬০ ইসি ২ মিলি প্রতি এক লিটার পানিতে মিশিয়ে মোচা বের হওয়ার সাথে সাথে একবার, কাঁদিতে প্রথম কলা বের হওয়ার পর একবার এবং সম্পূর্ণ কলা বের হওয়ার পর আরও একবার, মোট তিনবার গাছে প্রয়োগ করতে হবে। কান্ডের উইভিল পোকা পোকার কীড়া গাছের গুড়ি খেয়ে ছিদ্র করে, যা পরে পচে কালো হয়ে যায়। গুড়ি পচার দরুন মাটি থেকে পানি ও খনিজ পদার্থ গ্রহণ করতে গাছ বাধা পায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ গাছের ফল ছোট হয়, ফলন কম হয় এবং অনেক সময় গাছ গোড়াসহ উপড়ে পড়ে। প্রায়ই মুড়ি ফসলে কান্ডের উইভিল পোকার আক্রমণ দেখা যায়। ১. গাছের গুড়ি বা রাইজম ছোট ছোট করে কেটে শুকিয়ে পোকার বংশ বিস্তার রোধ করতে হবে। ২. পূর্ণাঙ্গ পোকা ফাঁদ পেতে ধরে মেরে ফেলতে হবে। ৩. গাছের গোড়ার চতুর্দিকে কীটনাশক ওষুধ (ডাই-এলড্রিন অথবা এলড্রিন) ব্যবহার করতে হবে। ৪. আক্রান্ত গাছে সাকার ব্যবহার না করা। টিস্যুকালচার সাকার ব্যবহার করা ভালো। ৫. সাকার লাগানোর আগে গুড়ির আক্রান্ত অংশ চেছে ফেলে দিতে হবে। ৬. গরম পানিতে (৫২ থেকে ৫৫ ডিগ্রী সে.) সাকার ডুবিয়ে (১৫ থেকে ১৭ মিনিট) উইভিল দমন করা যায়। জাবপোকা এ পোকা বানচি টপ ভাইরাস রোগের বাহক। তাই এর গুরুত্ব কম নয়। এ পোকা পাতার খোলের ভিতর ও ভূয়াকান্ডের গোড়ায় থাকে। রগর, মেটাসিস্টক নামক ওষুধ স্প্রে করে জাবপোকা দমন করা যায়। থ্রিপস পোকা এ পোকা কচি ফল খেয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে, তাই ফল বড় হওয়ার সাথে সাথে কলার খোসা অমসৃণ দেখায় এবং কখনও কখনও ফেটেও যায়। কাঁদির উপরের ফানার কলার বাহিরের দিকটা বেশি অমসৃণ হয় এবং আস্তে আস্তে কলার বোঁটার দিকে অগ্রসর হয়। ১. মোচা বের হওয়ার সাথে সাথে ন্যাপসেক স্প্রেয়ারের নলের মাথায় এক ধরনের সুচ লাগিয়ে ডেসিস নামক কীটনাশক ইনজেকশনের মাধ্যমে মোচায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। ২. ডারসবান নামক কীটনাশক মিশ্রিত পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এ পোকার হাত থেকে কলাকে রক্ষা করা যায়। ৩. গাছের গোড়া সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কলার ভূয়াকান্ড ছিদ্রকারী পোকা এ পোকা ভূয়াকান্ড ছিদ্র করে লম্বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং অনেক সময় ভিতরের মাইজ খেয়ে নষ্ট করে। ফলে গাছ ঝড়ো বাতাসে বা এমনিতেই ভেঙ্গে পড়ে। ১. আক্রান্ত গাছ বাগান থেকে তুলে ফেলতে হবে। ২. পুরাতন পাতা, আবর্জনা, মরা গাছ ইত্যাদি থেকে বাগান পরিষ্কার রাখতে হবে। ৩. আক্রান্ত বাগান থেকে চারা সংগ্রহ না করা। ৪. গাছের গোড়ার চারদিকে ডাই-এলড্রিন বা এলড্রিন ছিটাতে হবে। রোগবালাই রোগের নাম লক্ষণ প্রতিকার ফিউজেরিয়াম উইল্ট বা পানামা জমিতে গাছ হলুদ হয়ে মরে যাওয়াই এ রোগ চেনার প্রধান উপায়। আক্রান্ত গাছে মোচা ধরে না। কোন কোন সময়ে মোচা ধরলেও সে সব মোচার ফল চিকন ও অস্বাভাবিক ছোট হয় যেটা মোটেই খাবারযোগ্য নয়। ১. রোগমুক্ত চারা রোপণ করতে হবে। ২. ছায়ামুক্ত, পানি জমে না এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। ৩. জমিতে অম্লত্বের পরিমাণ কমানোর জন্য প্রয়োজনমত চুন প্রয়োগ করতে হবে। ৪. রোগাক্রান্ত গাছ শিকড় ও চারাসহ তুলে জমি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। ৫. রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে। ৬. আক্রান্ত জমিতে ৩ থেকে ৪ বছর কলার না করা। ৭. জমি থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সিগাটোকা বা পাতার দাগ রোগ এ রোগের আক্রমণে পাতার উপর গোলাকার বা ডিম্বাকৃতির গাঢ় বাদামী রঙের দাগ পড়ে। ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হলে পাতা ঝলসে যায় ও দূর থেকে পুরো গাছের পাতা আগুনে ঝলসে গেছে বলে মনে হয়। ফল ছোট আকারের হয় এবং গাছের ফলন অনেক কমে যায়। ১. জমি সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং জমিতে যেন পানি না জমে তার ব্যবস্থা করতে হবে। ২. এ রোগের প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ৩. রোগ দেখা মাত্রই প্রপিকোনাজল জাতীয় ছত্রাকানাশক যেমন টিল্ট-২৫০ ইসি, ফলিকুর ইত্যাদি প্রতি লিটার পানিতে আধা মিলি হারে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ৪ থেকে ৫ বার স্প্রে করতে হবে। ৪. কলা কেটে নেয়ার পর গাছটিকে জমি থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে। বানচি টপ বা ঝাকালো মাথা রোগ এ রোগ হলে কলা গাছ খাটো হয়ে যায়। পাতাগুলো ছোট হয় এবং উপরের দিকে দাড়ানো থাকে। দেখলে মনে হয় যেন এক জায়গা হতে সব পাতাগুলো বের হয়েছে। এ অবস্থায় দূর থেকে ঝাকড়ার মত দেখায় চারা অবস্থায় আক্রান্ত হলে ফল হয় না। ১. সুস্থ কলার চারা সংগ্রহ করতে হবে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা সবচেয়ে নিরাপদ। ২. জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করে জাব পোকা দমন করতে হবে। ৩. আক্রান্ত গাছ জমি থেকে তুলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। মোকো বা পচন রোগ এ রোগের কারণে বয়স্ক পাতা নেতিয়ে যায় এবং কচিপাতা ফ্যাকাশে অথবা হলুদ হয়ে যায়। নতুন সাকার থেকে হলুদ অথবা কালো রংয়ের পাতা বের হয়। কান্ডের কাছে পাতার বাকলের ভিতরের অংশ কালো হয়ে যায়। কান্ডের গোড়ায় আঠাল পদার্থ বের হয়ে আসে। ১. সুস্থ সাকার লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা সবচেয়ে নিরাপদ। ২. পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ ও পরিষ্কার কৃষি যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। ৩. রোগাক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৪. শস্য পরিক্রমায় দানাদার জাতীয় শস্যের চাষ করতে হবে। কলার ক্ষত এবং পচন রোগ জমিতে কলার গায়ে কালো রংয়ের ক্ষত দেখা যায়। আস্তে আস্তে এ সমস্ত ক্ষত বড় হতে থাকে যার ফলে সংগ্রহ পরবর্তীতে কলা দ্রুত পচে যায়। জমিতে আক্রান্ত কলা অকালে পেকে যায়। ১. পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ যেমন- ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, গাছের শুকনো পাতা ইত্যাদি জমি হতে পরিষ্কার করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে, জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। ২. কলা বের হওয়ার মুহূর্ত হতে ১০ দিন পরপর টিল্ট-২৫০ প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি লিটার হারে ২ বার স্প্রে করতে হবে এবং কলা কর্তনের পর মেরকোজেব নামক ছত্রাকনাশকের দ্রবণে (২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে) ২ থেকে ৩ মিনিট ডুবিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। ৩. ঠান্ডা পরিবেশে (সকালে অথবা বিকালে) কলা কর্তন করে ঠান্ডা ঘরে রেখে (১৫ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায়) দ্রুত এর তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলতে হবে। ৪. কর্তনের সময় অথবা পরিবহনের সময় কলায় যাতে কোন প্রকার ক্ষতের সৃষ্টি না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিকড়ে ক্ষত বা দাগ রোগ প্রাথমিক অবস্থায় কলার শিকড়ে ক্ষত সৃষ্টি হয় যা পরবর্তীতে বাদামী বা কালচে বর্ণ ধারণ করে। শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায় এবং পচন ধরে। এ ক্ষত ও পচন কলার গাছের গুড়িতেও দেখা যায় এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়। ১. আক্রান্ত জমিতে কলার চাষ না করে ৩ থেকে ৪ বছর গম, ভুট্টা, ধান, শাক সবজি ইত্যাদি যে সমস্ত ফসলে এর আক্রমণ কম হয় তার চাষ করতে হবে। ২. রোগাক্রান্ত জমি হতে কলার চারা সংগ্রহ না করে সুস্থ জমির চারা সংগ্রহ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা সবচেয়ে নিরাপদ। ৩. জমিতে চারা লাগানোর অনন্ত: ১ মাস আগে প্রতি হেক্টর জমিতে ৪ থেকে ৫ টন মুরগীর বিষ্ঠা কাঁচা অবস্থায় জমিতে প্রয়োগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে ফেলে রাখতে হবে। ৪. প্রতিটি গাছের গোড়ায় ফুরাডান ৫ জি ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম হারে ৩ থেকে ৪ মাস পরপর প্রয়োগ করতে হবে। ফানা পচা রোগ এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হলো ফানার গোড়া নরম ও কালো হওয়া। ফানার কালো অংশে সাদাটে ছত্রাক জন্মাতে দেখা যায়। রোগটি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে এবং কলার বোঁটা ও কলায় ছড়িয়ে যায়। বোঁটা পচে যাওয়ায় কলা সহজেই ফানা থেকে ঝড়ে পড়ে। ১. মাঠে এবং কলা সংগ্রহোত্তর সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। ২. কলা কাঁদি থেকে ফানা কাটার পর পরই পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলতে হবে। ৩. কাঁদি থেকে ফানা কেটে ছত্রাকনাশক ইমাজলিল অথবা থাইবেনডাজল অথবা বেনলেট মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে নেয়া অথবা ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। ৪. যে স্থানে ফানা কাটা হবে সেস্থান অবশ্যই রোগমুক্ত হতে হবে। এ্যানথ্রাকনোজ বা ফোস্কা কলার গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হলে সেখানে এ্যানথ্রাকনোজ রোগ হতে দেখা যায়। সাধারণত: অতিরিক্ত পাকা কলাতে এ রোগ বেশি হয়। এ রোগের ফলে কলার গায়ে বাদামী বর্ণের গোলাকার দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং ধূসর বর্ণ ধারণ করে। কলার আক্রান্ত অংশ খোসার স্তর থেকে কিছুটা বসে যায়। পাকা কলাতে দাগ তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায়। এ রোগে আক্রান্ত কলার স্বাদ কমে যায়। ১. পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করতে হবে। ২. মরা পাতা ও গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ৩. কলা সংগ্রহের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে ফলের গায়ে ক্ষত না হয়। ৪. পরিবহনের সময় কলা এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে কলার গায়ে বেশি চাপ বা আঁচড় না পড়ে। ৫. প্যাকেজিং ষ্টেশন সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মাঝে মাঝে ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্র্রে করতে হবে। কৃমি বা নেমাটোড কৃমি (নেমাটোড) কলার একটি মারাত্নক রোগ। কৃমি রোগ দু’ভাবে কলাগাছের ক্ষতি করে থাকে। প্রথমত: কৃমি আক্রান্ত শিকড়ে অতি সহজে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। শিকড়টি অতি সহজেই কালো হয়ে পচে যায়। ফলে মাটিহতে গাছ আর খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। গাছ দুর্বল ও অপুষ্টিতে ভোগে। কলার ফলনও ব্যাপকভাবে কমে যায়। দ্বিতীয়ত: কলার শিকড়ের মাটি আকড়িয়ে থাকার যে ক্ষমতা সেটা না থাকায় ফলন্ত গাছ অতি সহজেই ঝড়ে বা বাতাসে পড়ে যায়। বাংলাদেশে প্রধানত: চার প্রজাতির কৃমি কলা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে থাকে। যেমন- কৃমির নাম লক্ষণ দমন ব্যবস্থা সুড়ঙ্গ কৃমি এ কৃমি কলাগাছের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। এর আক্রমণের লক্ষণ হলো শিকড়ের এখানে সেখানে প্রথমে কালো দাগ পড়ে। তারপর ক্রমান্বয়ে দাগগুলি এক সঙ্গে মিশে সম্পূর্ণ শিকড়টি পচে যায়। শিকড়টি পচে গেলে মাটিতে বাহির হয়ে আবার নতুন শিকড়ে আক্রমণ করে। শিকড়ের ব্যাপক ক্ষতি হলে গাছ দুর্বল ও খর্বাকৃতি হয় এবং ফলন কমে যায়। ১. ২ থেকে ৩ বছরের জন্য শস্য পর্যায় অনুসরণ করতে হবে। ২. কলাগাছ গোড়াসহ উঠিয়ে আক্রান্ত জমি ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। ৩. ১০ থেকে ১২ মাসের জন্য কলার জমি পতিত রাখতে হবে। ৪. রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে। ৫. টিস্যুকালচারের মাধ্যমে তৈরি চারা ব্যবহার করতে হবে। ৬. আক্রান্ত চারা ব্যবহার করলে সে ক্ষেত্রে লাগানোর আগে চারার গোড়ার কালো দাগ সম্পূর্ণ চেঁছে ফেলতে হবে। ৭. আক্রান্ত চারা গরম পানিতে (৫৫ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় ২০ মিনিট) ডুবিয়ে রাখতে হবে। ৮. চারা লাগানোর আগে গর্তে নেমাটিসাইড প্রয়োগ করতে হবে। ৯. বছরে ৩ থেকে ৪ বার জমিতে ফুরাডান ৫ জি বা বিস্টাবেন ৫ জি (৪৫ থেকে ৬০ কেজি প্রতি হেক্টর) বা রাগরি ১০ জি (৩০ কেজি প্রতি হেক্টর) প্রয়োগ করতে হবে। স্পাইরাল কৃমি এ কৃমির আক্রমণের লক্ষণ সুড়ঙ্গ কৃমির মতই। কেবল মাত্র পার্থক্য হচ্ছে কালো দাগগুলি শিকড়ের শুধুমাত্র বহির্ভাগে সীমাবদ্ধ থাকে এবং দাগের বিসত্মার একটু ধীরে ধীরে ঘটে। কৃমির সংখ্যা অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে গাছের ব্যাপক ক্ষতি হয় যেমন ফল দেরিতে আসে, ফলন কম হয় এবং গাছ পড়ে যায়। শিকড়ের গুটি কৃমি শিকড়ের গুটি কৃমি প্রায় সব কলার জমিতেই দেখা যায় কিন্তু সচরাচর কলার অপর তিনটি কৃমির মত সব সময় ক্ষতি করে না। এ কৃমির আক্রমণ ব্যাপক হলে শিকড়ের তথা গাছের ভীষণ ক্ষতি হয় এবং ফলন কমে যায়। এর আক্রমণে শিকড়ে গুটির সৃষ্টি হয় এবং শিকড়ের স্বাভাবিক আকৃতির বিকৃতি ঘটে যা সহজেই শনাক্ত করা যায়। শিকড়ের ক্ষত সৃষ্টিকারী কৃমি শিকড়ের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি করতে করতে এদিক সেদিক বিচরণ করে। শিকড়ে ঘা এর মত কালো কালো দাগ হয়। ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ শিকড় পচে কালো হয়ে যায়। এ কৃমির আক্রমণে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার অনুপ্রবেশ সহজ হয় এবং এরা পরবর্তীতে শিকড় আরো বেশি করে পচিয়ে দেয় বা পচনকে ত্বরান্বিত করে।   ফসল সংগ্রহ/ফলন/ফসল সংগ্রহের পর করণীয় ফসল সংগ্রহ ফসল তোলার উপযোগী বৈশিষ্ট্য সংগ্রহের উপযোগী সময় কতদিন সময় লাগবে সাধারণত: মোচা আসার আড়াই থেকে তিন মাস পর কলা সংগ্রহ করা যায়। তাছাড়া কলার অগ্রভাগের পুষ্পাংশ শুকিয়ে গেলে, কলা হলুদাভ রং ধারণ করলে এবং কলার গায়ের শিরাগুলি পুষ্ট হলে কলা সংগ্রহ করতে হবে। কলা দিনের যে কোন সময় কাটা গেলেও সকাল বেলা যখন তাপমাত্রা কম থাকে তখন কাটাই ভালো। রোপণের ১০ থেকে ১৫ মাসের মধ্যেই সাধারণত: সব জাতের কলা পরিপক্ক হয়ে থাকে। ফলন প্রকার ফলন (টন/হেক্টর) অমৃতসাগর ১৫ সবরি ১৫ চাঁপা ১৫ কাঁচ কলা ১৫ বারি কলা-১ ৩৫ বারি কলা-২ ২০ মুড়ি ফসল প্রথম ফসলের চেয়ে মুড়ি ফসলের ফলন বেশি হয়। তিন বছরের বেশি কোন মুড়ি ফসল রাখা ঠিক নয়। ফসল সংগ্রহের পর করণীয় ক. কাঁদি থেকে ফানা আলাদাকরণ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্প্রতি কাঁদি থেকে ফানা আলাদা করার জন্য একটা ছোট যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে যা দিয়ে খুব সহজে অক্ষত অবস্থায় কম সময়ে কাঁদি থেকে কলার ফানা আলাদা করা যায়। যন্ত্রটি কাঁদির ডাটির ব্যাসের সাথে সামাঞ্জস্য রেখে বাঁকানো, ধারালো লোহার তৈরি যা ‘টি’ আকৃতির হাতলের মাথায় লাগানো থাকে। এক হাতে যন্ত্রতি কলার ফানায় বসিয়ে আরেক হাতে চাপ দিলেই খুব সহজে পুরো ফানাটা কেটে যায়। কাঁদি থেকে ফানা আলাদা করার সময় যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সেজন্য কাঁদির নীচে কলার পাতা বা অন্য কিছু বিছিয়ে দিতে হবে। কলার সংগ্রহোত্তর প্রতিটি ধাপের কাজই ছায়াযুক্ত স্থানে করতে হবে। খ. পুষ্প অপসারণ এক হাতে কর্তিত ফানা নিয়ে অন্য হাতে কলার শেষ প্রান্তের শুষ্ক পুষ্প সরিয়ে ফেলতে হবে। কারণ শুষ্ক পুষ্পের সাথে রোগবালাই ও পোকামাকড় থাকতে পারে। গ. ধৌত ও বাছাইকরণ • ফানাগুলো পরিষ্কার পানিতে অথবা ১০ পিপিএম ক্লোরিনযুক্ত পানিতে ডুবিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। • কলার গায়ে গেলে থাকা কষ, ময়লা ও রোগজীবাণু দুর করতে হবে। • বাছাইয়ের সময় কাটা, পচা, দাগওয়ালা, পাকা, বাঁকা, জোড় কলা, রোগাক্রান্ত, পোকামাকড় দ্বারা ক্ষত, খুব বড় বা ছোট কলা বাতিল করতে হবে। • বাছাই করার সময় প্রতি ফানায় চাহিদা মোতাবেক ৪/৫ থেকে ৮টি কলা রেখে বাকিগুলো কেটে ফেলতে হবে। • ফানার দুই পার্শ্বের ৩ থেকে ৪টি কলা ভিতরের কলার আকারের চেয়ে বড় হওয়ায় বাতিল করতে হবে। • সংগ্রহোত্তর সময়ে কলার ফানায় যাতে পচন না ধরে সেজন্য পরিষ্কার ও বাছাইকরণের পর ছত্রাকনাশক ওষুধ বেনমিল অথবা থায়াবেনডাজল অথবা ইমাজলিল মিশ্রিত পানিতে কলা পাঁচ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে অথবা কলার গাছে স্প্রে করতে হবে। ঘ. লেবেলিং বিদেশে রপ্তানির জন্য প্যাকেজিং এর আগে প্রতি ফানায় দুটি কলার গায়ে লেবেল লাগিয়ে দিতে হবে। লেবেলে কোম্পানির নাম ও কলার জাতের নাম লিখে দিতে হবে। ঙ. প্যাকেজিং প্যাকেজিং এর উদ্দেশ্য হলো আঘাত থেকে কলাকে রক্ষা করা, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুবিধা এবং আকর্ষণীয় করা। এজন্য বাঁশের ঝুড়ি, কাঠের বাক্স ও কাটুন ব্যবহার করতে হবে। নাড়াচাড়া করার সময় কলা যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সেজন্য ঝুড়ির ভিতরে খবরের কাগজ, কলা পাতা অথবা পলিথিন কাগজ ব্যবহার করতে হবে। বাঁশের বুকের অংশ দ্বারা তৈরি ঝুড়ি ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ এতে ঝুড়ি দুর্বল হয় এবং প্যাকেজিং করার সময় অথবা পরে পরিবহনের সময় বাঁকা হয়ে কলার ক্ষতি সাধন করতে পারে। কার্টুন বাক্সের সুবিধা • হালকা, পরিষ্কার ও সমতলবিশিষ্ট • সহজে লেবেল আটা যায় • প্রয়োজনমাফিক আকারের তৈরি করা যায় • খালি বাক্স ভাঁজ করে রাখা যায় • সংরক্ষণে খুব কম সময় লাগে কার্টুন বাক্সের অসুবিধা • পুনরায় ব্যবহারযোগ্য নয় বিধায় খরচ বেশি পড়ে • খুব সহজে পানি শোষণ করে নষ্ট হয়ে যায় • পানি শোষণ প্রতিরোধী বাক্স তৈরি করা যায়, তবে খরচ বেশি আরও বেশি হবে। কার্টুন বাক্সে কলা ভর্তি করার নিয়মাবলী ১. কার্টুন বাক্সে প্রথমেই ছিদ্রযুক্ত পাতলা পলিথিন লাইনার দিতে হবে। ২. কলার শুকনা ফানা দুই সারিতে বাক্সে রাখতে হবে। ৩. ফানার উপর পাতলা পলিথিন দিয়ে আরও দুই সারি ফানা বসাতে হবে। ৪. বাক্সের পলিথিন লাইনার চতুর্দিক থেকে টেনে এনে মুচড়িয়ে কলার সারির মধ্যে ঢুকাতে হবে। ৫. ছিদ্রযুক্ত ঢাকনা কার্টুন বাক্সে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে বাক্সের নীচের দিকের ছিদ্রগুলোর সাথে মিলে যায়। সংরক্ষণ/বংশবিস্তার/বিকল্প ব্যবহার/অধিক ফলনের জন্য পরামর্শ সংরক্ষণ পদ্ধতি পদ্ধতি আর্দ্রতা/তাপমাত্রা সংরক্ষণ সময় ১. পলিথিন ব্যাগে ঢুকিয়ে ভিতরের বাতাস বের করে মুখ শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। ২. পলিথিনের মধ্যে পটাশিয়াম পার ম্যাংগানেট ব্যবহার করলে আরো বেশিদিন রাখা যায়। ৮৫ থেকে ৯০% আর্দ্রতায় এবং ১৩ থেকে ১৪ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায়। ২ থেকে ৩ সপ্তাহ। বংশ বিস্তার গাছের রাইজম বা গোড়া থেকে অঙ্গজভাবে উৎপন্ন চারা/সাকার/তেউরের সাহায্যে কলার বংশ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। গাছের গোড়া থেকে দু’ধরনের তেফর বা চারা বের হয় যথা- অসি তেউর ও পানি তেউর। অসি তেউর মূল কন্দ থেকে বের হয়। অসি তেউরের পাতা পুরু, গুড়ি বড় এবং চারা শক্তিশালী। অপরদিকে, পানি তেউর বের হয় গাছ রোগাক্রান্ত বা আঘাত প্রাপ্ত হলে অথবা ফল আহরণের পর। পানি তেউরের পাতা চওড়া, গুড়ি দুর্বল ও ছোট। তাছাড়া গাছের অঙ্গজ বংশ বৃদ্ধির আরেকটি নতুন পদ্ধতি আছে। এ পদ্ধতিতে গাছের কোন ক্ষুদ্র অংশ থেকে ল্যাবরেটরিতে টেষ্ট টিউবের ভিতরে কৃত্রিম উপায়ে অল্প সময়ে প্রচুর সংখ্যক ভাইরাসমুক্ত চারা তৈরি করা হয়। যেহেতু টিস্যু দিয়ে কাজ করা হয় তাই একে টিস্যুকালচার পদ্ধতি বা মাইক্রোপোপাগেশন বলা হয়। এ পদ্ধতিতে বিটপের অগ্রভাগ ব্যবহারের সফলতা বেশি। টিস্যুকালচারের সুবিধা ১. চারা তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়; ২. চারার মুত্যুহার কম; ৩. চারা রোগমুক্ত থাকে; ৪. সব চারার বৃদ্ধি সমান হয়; ৫. সব গাছের ফুল প্রায় একই সাথে আসে; ৬. সব গাছের ফল আহরণ প্রায় একই সাথে হয়; ৭. ফল পেতে সময় কম লাগে; ৮. রোগ ব্যবস্থাপনা কম নিতে হয়; ৯. শ্রমিক খরচ কম লাগে; ১০. ফলন বেশি হয়। বিকল্প ব্যবহার ফল : কলা প্রধানত: পাকা ফল হিসাবেই খাওয়া হয়, তবে এর থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা যায়, যেমন চিপস, ময়দা, জ্যাম, জেলী, কোমল পানীয়, মার্মালেট, পুরি, সিরাপ, কেচাপ, ফ্লোক্স, আইসক্রিম, ভিনেগার, মোরব্বা, কলার কিউ, বেবীফুড ইত্যাদি। পাকা কলা দৈনন্দিন নাস্তা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে (বিবাহ বার্ষিকী, জন্মদিন, ইফতার পার্টি, পুজাপার্বন, অফিসে সেমিনার/মিটিং ইত্যাদি) ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে কাষ্টার্ড তৈরিতে কলা অদ্বিতীয়। গ্রামের লোকজন আজও দুধভাতের সাথে কলা ও শীতকালে কলার পিঠা খেতে ভালোবাসে। কলার কিছু কিছু জাত আছে যা সবজি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কাঁচকলার ভর্তা, তরকারী ও চপ অনেকের প্রিয় খাদ্য। তাছাড়া কাঁচকলা ডায়রিয়া হলে ও পাকা করা কোষ্ঠকাঠিন্যতা দুরীকরণে পথ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ভূয়াকান্ড : ভূয়াকান্ড থেকে কাগজ, বোর্ড ও টিস্যুপেপার তৈরি করা যায়। এর ভিতরের নরম অংশ (মাইজ) সবজি হিসাবে খাওয়া যায়। এ থেকে আঁশ পৃথক করে রশি তৈরি করা যায়। এটি গ্রামেগঞ্জে নৌকা, পুল, হস্তশিল্প ইত্যাদি তৈরিতে এবং জ্বালানী ও এর ছাই সাবানের বিকল্প ক্ষার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ভূয়াকান্ড পশুর খাদ্য হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। পাতা : পাতা জ্বালানী, প্যাকিং, গ্রামেগঞ্জে অনুষ্ঠানে খাবারের থালা, পশুর খাদ্য, ছাতা ও ধানের বীজতলার ঢাকনা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বগুড়া এলাকায় পাতার মধ্যশিরা (কাগনা) সবজি হিসাবে খাওয়া হয়। থোড় : কলার থোর একটি মজাদার সবজি। গাছ : কলাগাছ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ করে গ্রামের বিবাহ বাড়িতে ও পুজা পার্বনে গেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অধিক ফলনের জন্য পরামর্শ • চারা লাগানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মাতৃগাছের সাথে লাগানো কাটা অংশটি রোপণের সময় দক্ষিণ দিকে থাকে। এতে উত্তরদিকে কলার ছড়া আসবে যা মানসম্পন্ন কলা উৎপাদনে সহায়ক। • কলা ধরার সময় শেষ ফানার ৪ থেকে ৫ সেমি নীচে মোচা কেটে দিলে কলা পুষ্ট হয়; পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হয়। • নিয়মিত পরিমিতভাবে কলাগাছের গোড়ায় মাটি দিয়ে রাখতে হবে। • মূলগাছের চারদিকে জন্মানো সব নতুন চারা গোড়াসহ কেটে গবাদিপশুকে খাওয়ানো যায়। শুধু মূলগাছে ফুল আসলে সুস্থ সবল চারা দেখে মাতৃগাছের উত্তর পাশে একটি চারা পরবর্তী মুড়ি ফসলের জন্য রেখে দিতে হবে। • কলার কাঁদি পরিপক্ক হবার পর মূল গাছের গোড়া থেকে না কেটে, মানুষের বুক বা গলা সমান রেখে কেটে দিতে হবে। এতে মুড়ি ফসল বা চারা পোকা এবং রোগে কম আক্রান্ত হবে। • সবসময় মরা, রোগাক্রান্ত, হলুদ, শুকনো পাতা ছাঁটাই করে গাছ এবং বাগানকে পরিষ্কার রাখতে হবে। ৭ থেকে ৮ টি সুস্থ সবল পাতা থাকলেই যথেষ্ঠ। সারের উপরিপ্রয়োগের সময় বাড়িয়ে দিলে সুস্থ পাতার সংখ্যা ও ফলন বাড়ে। • কলা গাছে ঠিকা দেওয়ার সময় বাঁশ ব্যবহার না করে প্লাস্টিক বা নারকেলের রশি ব্যবহার করা ভালো। রশির একপ্রান্ত গাছের কাঁদির নীচে বেঁধে অপরপ্রান্ত কাঁদির বিপরীত দিকের আরেকটি গাছের গোড়ায় টান করে বেঁধে দিতে হবে। তথ্যসূত্র ১. আম ও আনারসের প্রক্রিয়াজাতকরণ, সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খামারবাড়ী, মধ্যভবন, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, এপ্রিল ২০০৭। ২. কলা চাষ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, ২০০১। ৩. কলা উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল-ড. মো: আবদুল হক ও ড: মো: মোজাফফর হোসেন, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, ২০০১। ৪. কলা চাষ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, শক্তিশালীকরণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প, কৃষিবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, তথ্য অফিসার (কৃষি), খামারবাড়ী, ঢাকা-১২১৫, জুলাই, ২০০৬। ৫. ফলের আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর, জুন, ২০০৫। ৬. কলা এবং পেঁপের প্রধান রোগসমূহ এবং তাদের দমন ব্যবস্থাপনা, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০১, ডিসেম্বর ২০০৪। ৭. ফসল প্রকল্পের জেলাভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তি গাইড বই, ফসল সমন্বয় প্রকল্প/ইরি, নভেম্বর ২০০৭।
Thursday, 30 September 2010 | 571 hits
নাগরিক সেবা বিষয়ক তথ্য/স্বাস্থ্য
সাধারণ স্বাস্হ্য পরিচর্যা গুরুত্ব রোগমুক্ত, সুস্হ্য ও কর্মময় জীবনযাপনের জন্য ব্যক্তিগত স্বাস্হ্য পরিচর্যার কোন বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত স্বাস্হ্য পরিচর্যার অভাবে অতি সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ব্যক্তিগত স্বাস্হ্য রক্ষায় করণীয় • সকালে নাস্তার পর এবং রাতে ঘুমুবার আগে দাঁত মাজতে হবে। • কাপড়-চোপড়, বিছানাপত্র এবং ত্বক নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। • হাতের নখ নিয়মিত কাটবেন। সপ্তাহে অন্তত একবার চুলে সাবান বা শ্যাম্পু দিতে হবে। • বাড়ীঘর, ৰাশেপাশের নালা-নর্দমা, গৃহস্হালীর ময়লা আবর্জনা পচা পুকুর, কচুরীপানা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। • গৃহপালিত পশুপাখীদের মলমূত্র, ময়লা আবর্জনা বাড়ীর বাইরে গর্ত করে তাতে ফেলতে হবে। • পুকুর, নদী, জলাশয়ের ধারে বা যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করবেন না। স্বাস্হ্য সম্মত পায়খানায় মল ত্যাগ করতে হবে। • পানকরা, অজু করা, ধোয়া-মোছা এবং অন্য সকল কাজে টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতে হবে। • নর্দমা, পচা ডোবা, পুকুর বা পায়খানা থেকে অন্তত ১৫ গজ দূরে টিউবওয়েল স্হাপন করতে হবে। কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা পানিতে ডোবা • পানিতে ডুবে যাওয়া লোকের মুখ ও নাক পরিষ্কার করুন • পেট থেকে পানি বের করার জন্য মাটিতে উপুর করে শোয়ান • তার হাত দুটি তার কপালের নিচে রাখুন • একটি বালিশ বা কিছু কাপড় তার পেটের নিচে রাখুন এবং পিঠে মৃদু চাপ দিন সাপে কামড়ানো • সাপের কামড় বা সাপের কামড়ের মতো ক্ষত চিহ্নিত করুন • সাপে কাটা ক্ষত স্হান সাবান-পানি (সম্ভব হলে গরম পানি) দিয়ে ধুয়ে ফেলুন • ক্ষতের উপর দিকে চাপ দিয়ে পর পর দুইটি বাঁধন দিন • আক্রান্ত ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দিয়ে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠিয়ে দিন কুকুর/বিড়াল কামড়ালে • কুকুর বা বিড়ালকে চিহ্নিত করুন • মেরে না ফেলে তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখুন • কামড়ের স্হান সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন • লোকটিকে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠিয়ে দিন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হলে • মুখে-মুখে বা নাকে-মুখে শ্বাস-প্রশ্বাস চালানোর চেষ্টা করুন রক্তপাত হলে • সরাসরি ক্ষতের উপর চাপ প্রয়োগ করুন • প্রেসার ব্যান্ডের ব্যভহার করুন • ক্ষত যদি হাত বা পায়ের কোথাও হয় তবে ক্ষতের স্হান উঁচুতে রাখুন ক্ষত ড্রেসিং • ক্ষতস্হান সাবান-পানি/স্যাভলন পানি দ্বারা পরিষ্কার করুন • চাপ প্রয়োগ কুরন ও পরিষ্কার কাপড়ের বাঁধন দিন • হাসপাতালে পাঠিয়ে দিন পোড়া • পোড়া ঠান্ডা/সাবান পানিতে পরিষ্কার করতে হবে • পোড়া স্হানের উপর পরিষ্কার ড্রেসিং দিতে হবে • পানি/শরবত/স্যালাইন পানি খেতে উৎসাহিত করতে হবে • হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে হবে হাড় ভাঙা বা বিচ্ছন্ন হওয়া • হাড় ভাঙা বা বিচ্ছিন্ন জোড়া লাগানোর জন্য উপযোগী প্লাষ্টার দ্বারা বাধন দিতে হবে। • প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে হবে। সাধারণ স্বাস্হ্য তথ্য গলগণ্ড বা ঘ্যাগ বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটিরও বেশী মানুষ গলগণ্ডে আক্রান্ত। শরীরে আয়োডিনের অভাবে এ রোগ হয়। প্রতিরোধের উপায় : • বেশী করে তাজা শাক সবজি ও ফলমূল খেতে হবে। • সামুদ্রিক মাছে প্রচুর আয়োডিন আছে। মাঝে মাঝে সামুদ্রিক মাছ খেতে হবে। • প্রতিদিনের খাবারের সাথে সাধারণ লবণের পরিবর্তে আয়োডিন যুক্ত লবণ খেতে হবে। • গর্ভবতী মহিলা এবং শিশুদের খাবারে অবশ্যই আয়োডিন যুক্ত লবণ রাখতে হবে। কালাজ্বর কালাজ্বও একটি বিশেষ পতঙ্গবাহী রোগ। স্যান্ডফ্লাই বা বালুমাছির মাধ্যমে কালাজ্বরের জীবানু ছড়ায়। লক্ষণ : এই রোগে আক্রান্ত হয়ে যে সমস্ত লক্ষণ দেখা যায় সেগুলো নিম্নে দেয়া হলো : ১. দীর্ঘদিন যাবত অল্প অল্প জ্বও হয় ২. শরীরের ওজন কমে যায় এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় ৩. প্লীহা ও কলিজা স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যায় ও পরে পেট ফুলে যায় ৪. মুখমণ্ডল/গায়ের রং কালো হয়ে যায় প্রতিরোধের উপায় : • স্যান্ডফ্লাই বা বালু মাছির জন্ম রোধে মাটির দেয়ালের ফাটল বন্ধ করে দিবেন। • গোয়ালঘর বা মুরগীর খোয়াড়ের মেঝে ১৫ দিন পর পর মাটি দিয়ে লেপে দিবেন। • থাকার ঘর থেকে গোয়ালঘর ও মুরগীর ঘরের দূরত্ব বজায় রাখবেন। • বছরে দুবার করে কমপক্ষে পাঁচ বছর পর্যন্ত ডিডিটি ছিটাবেন। • সন্ধ্যার পর অন্ধকারে দাওয়ায় বসে গল্প-গুজব করা থেকে বিরত থাকুন। (যে এলাকায় কালাজ্বরের প্রাদুর্ভাব আছে) • কারো কালাজ্বর হয়েছে বলে সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হউন। • কালাজ্বর ধরা পড়লে পুরো মাত্রায় চিকিৎসা নিবেন। ফাইলেরিয়া ফাইলেরিয়া এক ধরনের পরজীবি ঘটিত রোগ যা কিউলেক্স মশার সাহায্যে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। লক্ষণ : ফাইলেরিয়া রোগ হলে শরীরের বিভিন্ন অংশ আস্তে আস্তে ফুলে যায় এবং ঐ অংশ বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে। সাধারণতঃ মানুষের পায়ে, বাহুতে ও অন্ডকোষে এই রোগ হয়ে থাকে। প্রতিরোধের উপায় : • কিউলেক্স মশার উৎপত্তিস্হল যেমন মজা পুকুর, নালা, ডোবা, জলাবদ্ধ জায়গা সবসময় পরিষ্কার রাখার জন্য জনগণকে সচেতন করতে হবে। • কর্ম এলাকায় যদি কোন লোকের অনেক দিন ধরে মাঝে মাঝে জ্বও এবং হাত পায়ের লসিকা নালী ফুলে লাল হয়ে যায় তাহলে তার রক্ত নিয়ে থানা স্বাস্হ্য কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। • নালা, ডোবা, মজা পুকুর, জলাবদ্ধ জায়গায় নিয়মিত মশক নিধন ঔষধ ছিটাতে হবে। • বাড়ীর আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখার জন্য জনসাধারণকে বলতে হবে। জন্ডিস জন্ডিস একটি সংক্রামক রোগ। এক প্রকার ভাইরাস এ রোগের কারণ। কিভাবে ছড়ায় : ১. জন্ডিস রোগীর মলমুত্র দ্বারা ২. দূষিত খাবার খেলে ৩. দূষিত পানির মাধ্যমে ৪. ইনজেকশনের সিরিঞ্জ এবং সূচের মাধ্যমে লক্ষণ : ১. রোগী দুর্বল হয় ২. ক্ষুধা কম হয় ৩. গায়ের রং হলুদ হয়ে যায় প্রতিরোধের উপায় : • পান করা, অজু করা, রান্না বান্না, গোসল করা, থালাবাসন ও ফলমূল ধোয়ার জন্য টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতে হবে। • টিউবওয়েলের পানি না থাকলে পানি ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে ব্যবহার করতে হবে। • ছোট বড় সকলে স্বাস্হ্য সম্মত পায়খানায় মল ত্যাগ করতে হবে। • খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের আগে হাত ভাল করে পরিষ্কার করতে হবে। • ইনজেকশন নিতে ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে। বার বার ব্যবহার করতে হলে সিরিঞ্জ ও সুঁচ ২০ মিনিট পানিতে ফুটিয়ে নিতে হবে। • পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সময়মত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। জন্ডিস আক্রান্ত রোগীর থালা-বাসন, কাপড়-চোপড়, বিছানাপত্র বাড়ির অন্য সদস্যরা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। • বাজারের খোলা পচা বা মাছি বসা খাবার খাবেন না। খাদ্য দ্রব্য সব সময় ঢেকে রাখতে হবে। ডেঙ্গুজ্বর ডেঙ্গুজ্বও এডিস মশাবাহিত ভাইরাস জনিত এক ধরনের তীব্র জ্বর। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত কোন ব্যক্তিকে আক্রান্ত হওয়ার ৬ দিনের মধ্যে কোন সাধারণ এডিস মশা কামড়ালে ঐ মশাটি ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রামিত হবে। এই মশাটি কোন সুস্হ ব্যক্তিকে কামড়ালেই সে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হবে। ডেঙ্গুজ্বরের প্রকারভেদ : ক. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বর খ. হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণসমূহ : ক. ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বর : ১. তীব্র জ্বও (১০৪/১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে) ২. বমি, পেট ব্যথা, মাথাব্যথা, কোমর ব্যথা, অস্হিসন্ধি বা জয়েন্ট ব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হয়। ৩. হাড় ব্যথা এতই প্রচণ্ড হয় যে, মনে হয় হাড় ভেঙ্গে গেছে। ৪. এই জ্বরে আক্রান্ত শিশুকে স্পর্শ বা নাড়াচাড়া করলেই শিশু কেঁদে উঠে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। ৫. শরীরের ত্বকে এলার্জিও মতো র্যাশ দেখা দিতে পারে। র্যাশগুলো কখনও কখনও চুলকানির উদ্রেক করে থাকে। খ. হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর : হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বরের উপসর্গগুলোই তীব্র হয়ে দেখা দেয়। এছাড়া- ১. চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয় ২. চোখে রক্ত জমাট বাঁধে ৩. নাক, মুখ, দাঁতের মাড়ি বা বমির সঙ্গে রক্ত যায়। ৪. শরীর ফ্যাকাসে ও ঠাণ্ডা হয়ে যায় ৫. রক্তচাপ হ্রাস পায় ৬. অতিরিক্ত পানির পিপাসা পায় ৭. ঘুম ঘুম ভাব বা ছটফট করা ৮. রোগী শিশু হলে অতিরিক্ত কান্না করে ৯. শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে ১০. লালচে কালো রঙের পায়খানা হয় ১১. শরীরে হামের মতো দানা দেখা দিতে পারে ১২. শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ-পত্যঙ্গ হতে রক্তক্ষরণ ও পেটে পানি জমতে পারে। ১৩. মস্তিষ্ক এবং হার্টেও মধ্যেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা পদ্ধতি : ডেঙ্গুজ্বরের এখনও কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ক্লাসিক্যাল বা হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বও উভয় ক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। ক. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বও : ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বও সাধারণ এমনিতেই ৭ দিনের মধ্যে ভাল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। যেমন ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, বমির জন্য স্টেমিটিল জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়। এছাড়া ডেঙ্গুজ্বরে প্রচার পানি পান করতে হয়। প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দিতে হয়। তবে রোগ সেরে যাওয়ার পর রোগীর দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, বিষণ্নতা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এগুলো আস্তে আস্তে সেরে যায়। খ. হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর : হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বও হয়েছে সন্দেহ হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিদিন রোগীর রক্তের প্লেটিলেট কাউন্ট এবং পিসিভি পরীক্ষা করতে হবে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরের রোগীর প্লেটিলেট কাউন্ট কমে গেলে রোগীকে শিরাপথে প্লেটিলেট ট্রান্সফিউশন করতে হবে। আর যদি রোগীর প্রত্যক্ষ রক্তক্ষরণ থাকে। যেমন- রক্তবমি হওয়া, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, নাক দিয়ে প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হওয়া ইত্যাদি তাহলে সেক্ষেত্রে রোগীকে রক্ত দেয়া যেতে পারে। সঠিক সময়ে ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা নিলে খুব সহজেই এর জটিলতাগুলো এড়ানো যায়। তবে স্মৃতব্য, ডেঙ্গুজ্বরের রোগীর ব্যথার জহন্য এসপিরিণ জাতীয় ওষুধ দেয়া যাবেই না। কারণ এতে রক্তক্ষরণ প্রবণতা বেড়ে যায়। শিশুদের ছয়টি মারাত্মক রোগ ধনুষ্টংকার জন্মের প্রথম সপ্তাহেই আঘাত হানে ধনুষ্টংকার। ক্ষতের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। লক্ষণ • চোয়াল শক্ত হয়ে যায় • শিশু আর দুধ টানতে পারে না • ক্ষণে ক্ষণে খিচুনী হয় • পরে সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে যায় • শরীর ধনুকের মত বেঁকে যায় • দশ দিনের মধ্যেই শিশুর মৃত্যুর হতে পারে। হাম হাম অত্যন্ত সংক্রামক। এই রোগ সেরে যাওয়ার পর শিশুর কাশি ও রক্ত আমাশয় দেখা দিতে পারে। ফলে শিশুরা দারুণ অপুষ্টিতে ভোগে আর অন্যান্য রোগের সহজ শিকারে পরিণত হয়। লক্ষণ • ১ম তিনদিন শিশুর সর্দি, কাশি ও জ্বর হয়। • চোখ দুটি লাল হয়ে যায় ও পানি পড়ে। • বুকে সর্দি ঘড়ঘড় করে। • কপালে ও কানের পেছনে ছোট ছোট ঘোলা লাল দানা দেখা যায়। • ৩য় ও ৪র্থ দিনে সমস্ত মুখে ও শরীরে গুটি ছড়িয়ে পড়ে। • চোখ রক্তবর্ণ হয়। • চোখে হলুদ পিচুটি দেখা যায়। যক্ষা যক্ষা একটি সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত যক্ষা রোগীর হাঁচি, কাশির দ্বারা বাতাসের সাহায্যে, কাপড় চোপড়, থালাবাসন ইত্যাদির মাধ্যমে এই রোগের জীবানু সুস্হ লোকের দেহে প্রবেশ করে। লক্ষণ • কাশি তিন সপ্তাহ বা তার অধিক যা সাধারণ চিকিৎসায় নিরাময় হয় না। • রোগীর অল্পমাত্রায় জ্বর থাকতে পারে এবং রাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। • ক্ষুধা মন্দা এবং ওজন কমা। • দূর্বলতা এবং অল্প পরিশ্রমে ক্লান্তি বোধ করা। • বুকে ব্যথা। • কফের সাথে রক্ত পড়া। হুপিং কাশি পাঁচ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেই হুপিং কাশিতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। লক্ষণ • প্রথম সপ্তাহে এই রোগে সাধারণত শিশুর সর্দি বা ঠাণ্ডা লাগার মত মনে হয়। • জ্বর হয় এবং নাক দিয়ে পানির মত সর্দি ঝরতে থাকে। • ২য় সপ্তাহে কাশি বাড়তে থাকে এবং অবস্হা মারাত্মক হয়ে ওঠে। • চোখ ফুলে ওঠে এবং লাল মাংসপিন্ডের মত দেখায়। • শিশুকে অনেক কষ্টে শ্বাস নিতে হয়। • কাশতে কাশতে নিঃশ্বাস নেবার সাথে 'হুপ' শব্দ বের হয়। • 'হুপ' শব্দের পর অনেকসময় শিশু বমি করে। পোলিও পোলিও রোগে হাজার হাজার শিশু সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে কাল কাটায়। অসুস্হতার পর শিশুর শরীর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অবশ হয় ও পরে শুকিয়ে যায়। লক্ষণ • প্রথমে অল্প জ্বর থাকে। • ৩ থেকে ৫ দিন শিশুর মাথাব্যথা, পেটের গোলমাল ও বমি হয়। • ঘাড়, গলা ও পিঠ শক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। • অনবরত জ্বরসহ পেশীতে ব্যথা হতে পারে। ডিপথেরিয়া ডিপথেরিয়া প্রথমে গলার সামান্য-ইনফেকশন বলে মনে হয়। অনেক সময় ডিপথেরিয়া শ্বাসনালীতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রোগী শ্বাস নিতে পারে না। জটিল আকার ধারণ করলে হৃদপিন্ডে ছড়িয়ে পড়ে এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যখন গলনালীতে ছড়িয়ে পড়ে তখন শিশু গিলতে পারে না। এ অবস্হায় শিশু মারা যেতে পারে। লক্ষণ • শিশুর জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয়। • গলা, নাক ও টনসিল আক্রান্ত হয়। • জটিল ক্ষেত্রে গলা ফুলে যায়। • গলা পরীক্ষা করলে গলায় একটি পর্দা বা মরলার সর দেখা যায়।   বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন পানি বিশুদ্ধকরণ পদ্ধতি • যে কোন উৎসের পানি ১০-১৫ মিনিট টগবগিয়ে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান ও ব্যবহারের উপযুক্ত করা যাবে। • যে কোন উৎসের পানি খোলা দেখলে উক্ত পানি একটা পাত্রে ৩০ মিনিট-১ঘন্টা বসিয়ে পূর্ণ তলানী হবার পর উপরের পরিষ্কার পানি অপর একটি পাত্রে রেখে ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করতে হবে। • বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট (হ্যালোজেন বড়ি) ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণতঃ ১০ সের/লিটার পানিতে ১৫ মিলিগ্রাম এর একটি পানি বিশুদ্ধ করার বড়ি মিশিয়ে ৩০ মিনিট পর উক্ত পানি ব্যবহার করা যায়। • মনে রাখতে হবে বিশুদ্ধকরণ বড়ি ৬ মাসের বেশী পুরানো হলে আর কার্যকরী থাকে না। • ব্লিচিং পাউডার দ্বারা পানি বিশুদ্ধ করা যায়। সাধারণতঃ ১২ সের (১ কলসী) পানির মধ্যে চা চামচের চারভাগের ১ ভাগ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে ৩০ মিনিট পর ব্যবহার ও পান করা যায়। পানি কিভাবে দূষিত হয় ? • পানির উৎসে কাপড়-চোপড়, থালা-বাটি ধোয়া, গোসল করলে • পানির উৎসে মলমূত্র ত্যাগ ও মৃত জীবজন্তু ফেললে বা জীবজন্তু গোষর করালে • বৃষ্টির পানিতে ময়লা বা আবর্জনা গড়িয়ে গেলে • বন্যা বা জলোচ্ছাসে • মাছের মড়ক লাগলে দূষিত পানির রোগ দূষিত পানি ব্যবহার বা পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, কৃমি, হেপাটাইটিস ইত্যাদি রোগ বিস্তার করে। আর্সেনিক জনিত পানি দূষন আর্সেনিক কি? আর্সেনিক একটি ধাতব পদার্থ। পানিতে গ্রহনযোগ্য মাত্রায় আর্সেনিক থাকলে (প্রতি লিটারে ০.০৫ মিলিগ্রাম এর কম) ক্ষতি নাই। কিন্তু অধিক মাত্রায় থাকলে আমরা তাকে আর্সেনিকজনিত দূষিত পানি বলতে পারি। আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণাদি একই উৎসের অধিক মাত্রায় আর্সেনিকযুক্ত পানি যারা দীর্ঘদিন (২৪-৬০ সপ্তাহ) ধরে পান করবে, তাদের অসুস্হতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমনঃ • পায়ের চামড়ার রঙে কোন পরিবর্তন, বিশেষ করে কাল দাগ। • হাত ও পায়ের তালু শক্ত ও খসখসে হয়ে যাওয়া। • আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তির ব্রংকাইটিস, ডায়রিয়া, যকৃতের রোগ, চোখ ওঠা, চামড়ায় ফুষকুরি, হাত-পায়ের স্নায়ু দুর্বল, উচ্চ রক্তচাপ, বৃক্ক রোগ,হৃদরোগ ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। • সবশেষে দেখা দিতে পারে পচন ও কর্কট রোগ বা ক্যান্সার। আর্সেনিক সমস্যায় করণীয় • নির্দিষ্ট কোন নলকপ বা ট্যাপের পানির ক্ষেত্রে উপরে উল্লেখিত সমস্যা দেখা দিলে সে পানি খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। • আর্সেনিক দূষনে কেউ আক্রান্ত হলে বা উল্লেখিত সমস্যা দেখা দিলে সত্বর স্হানীয় জনস্বাস্হ্য প্রকৌশল বিভাগকে অবহিত করতে হবে অথবা নিকটস্হ স্বাস্হ্য কেন্দ্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং রোগীকে হাসপাতালে প্রেরণ করতে হবে। • গাজা পানি না খেয়ে পানি যিতিয়ে খেলে বা জমা করে পরের দিন খেলে (তলানী নাড়াচাড়া না করে) বিষক্রিয়া হবার সম্ভাবনা কম থাকে। • আর্সেনিক পানির তলানি গোবরের গাদায় ফেলে পাত্র ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। মাদকাসক্তিজনিত তথ্য মাদকদ্রব্য গ্রহণে কি হয়? চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাদকদ্রব্য গ্রহণে মানুষের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও ক্ষতি হয়। ১. স্নায়ুমণ্ডলি মানসিক রোগ দেখা দেয়, স্মরণশক্তি কমে যায়। ২. চোখ-দৃষ্টি শক্তি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। ৩. রক্ত প্রণালী রক্তাসল্পতা দেখা দেয়, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ৪. হৃদযন্ত্র (হার্ট)- হৃদযন্ত্রেও কার্যকারীতা কমে যায়, হৃদযন্ত্র বড় হয়ে যায়। ৫. যকৃত (লিভার)- জন্ডিস, হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস, ক্যান্সার হয়। ৬. পরিপাকতন্ত্র- হজম শক্তি কমে যায়। আলসার, এসিডিটি, কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। ৭. বৃক্ক (কিডনী)- কিডনী ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে। ৮. প্রজনন তন্ত্র- যৌন ক্ষমতা কমে যায়, বিকৃত সন্তানের জন্ম হয়। ৯. ত্বক (স্ক্রিন)- চামড়া খসখসে হয়ে যায়, চুলকানি হয়, ফোড়া ও ঘা অনেক সময় শরীরে পচন ধরে। মরণব্যাধি ক্যান্সার ক্যান্সার কি? ক্যান্সার একটি মাত্র রোগ নয়। এটি এক প্রকার জটিল ব্যাধির গোষ্ঠী। কোটি কোটি কোষ নিয়ে আমাদের দেহ গঠিত। ক্যান্সারের সূচনা একটি কোষ থেকে। পরে একটা ক্যান্সারগ্রস্ত কোষ থেকে দুটি কোষ, দুটি থেকে চারটি কোষ, এভাবে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন শুরু হয়ে যায় এবং বিরামহীনভাবে তা চলতেই থাকে। ফলে অচিরে সেখানে একটি পিন্ডের বা টিউমারের সৃষ্টি হয়। ক্যান্সার রোগটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো এই যে, ক্ষতিকর টিউমার হলে তা শুধু স্হানীয়ভাবে আশেপাশেই অনুপ্রবেশ করে না, রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে শরীরের দূরবর্তী স্হানে গিয়েও নতুন বসতি স্হাপন করে। এভাবে ক্যান্সার কোষগুলো তার উৎপত্তিস্হল থেকে বহু দূরে অন্য কোন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তাই যথা সময়ে বিস্তারে বাধা না দিলে ক্যান্সার পরিনামে মৃত্যু ঘটায়। ক্যান্সারের আক্রান্তস্হল : শরীরের যে কোন অঙ্গেই ক্যান্সার হতে পারে। তবে বাংলাদেশে মুখ গহ্বর ও কণ্ঠনালীর ক্যান্সার বেশী। এছাড়াও দেখা যায় খাদ্যনালীর ক্যান্সার, লিভারের ক্যান্সার, রক্তে ক্যান্সার, লিল্ফগ্ল্যান্ডের ক্যান্সার ইত্যাদি। মহিলাদের মধ্যে প্রধান ক্যান্সার হলো- জরায়ু মুখের মুখগহ্বর ও স্তনের ক্যান্সার। মহিলাদেরও ক্যান্সার রক্তের ক্যান্সার, ওভারীর ক্যান্সার বর্তমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষণ : ক্যান্সারের সূচনায় যে লক্ষণগুলো দেখা দেয় তা হলো : • খুসখুসে কাশি কিংবা ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর • সহজে সারছে না এমন কোন ক্ষত • অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ • স্তনে বা শরীরের অন্য কোথাও চাকা বা পিন্ডের সৃষ্টি • গিলতে অসুবিধা বা হজমে গন্ডগোল • মলমূত্র ত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন • তিল বা আঁচিলের সুস্পষ্ট পরিবর্তন কারা এতে বেশী আক্রান্ত হয় : • বিড়ি, দোক্তা বা ধূমপানে অভ্যস্ত যারা • যারা মদ্যপান করে, যারা চর্বি জাতীয় খাদ্য বেশী খায় • যে মা তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ায় না • যাদের বাল্য বিবাহ হয়, বহু বিবাহ • যারা অবাধ যৌনভ্যাস, ব্যভিচার, পতিতালয়ে যেতে অভ্যস্ত • যাদের স্বামীদের বহুনারী ভোগ করার অভ্যাস আছে • যারা নিঃসন্তান • যে সমস্ত মহিলা ত্রিশ বছর বয়সের পর প্রথম সন্তান প্রসব করে • যে সমস্ত মহিলা বেঁটে ও মোটা প্রতিরোধ ক্যান্সার হলে গতি নাই এমন ধারণা অনেকের। আসলে কিন্তু তা সঠিক নয়। ক্যান্সারের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই মূল ভরসা। কারণ ক্যান্সার প্রতিরোধের যে নিয়ম কানুন সেগুলো যদি আমরা আন্তরিকভাবে মেনে চলি তাহলে আজকালকার শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ ক্যান্সারকেই ঠেকানো সম্ভব। ক্যান্সার প্রতিরোধে যা বর্জনীয় : • ধুমপান নিষেধ • তামাক চাষ, তামাক পাতায় প্রস্তু জর্দা, দোক্তা, কিমাম, শুপারী ইত্যাদি নিষেধ • মদ্যপান নিষেধ। • অত্যাধিক চর্বি বা অধিক চর্মিযুক্ত খাদ্য এবং যখন তখন খাওয়ার অভ্যাস পরিহার • শরীরের বাড়তি ওজন কমিয়ে আনা প্রয়োজন • বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে হবে • বহুস্বামী, অবধ যৌন সঙ্গম ও পতিতাবৃত্তি পরিত্যাগ করতে হবে • বিশ বছরের নীচে বিয়ে থেকে বিরত থাকতে হবে • ঘন ঘন অধিক সন্তান গ্রহণ থেকে ত্তি থাকতে হবে ক্যান্সার প্রতিরোধে যা করণীয় : • যে সব খাবারের আঁশ বেশী যেমন- ঢেটি ছাঁটা চাল, লাল চাল, লাল আটা, ছাতু, শাক সবজি এবং ফল- এগুলো বেশী খেতে হবে। • ভিটামিন 'এ' আছে এমন খাবার যেমন সবুজ শাকসবজি, হলুদ সবজি ও ফল, মিষ্টি আলু, গাজর, ছোট মাছ (মলা ঢেলা), দুধ এবং ফল প্রচুর পরিমাণে আহার করতে হবে। • ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি ও শালগম খেয়ে ক্যান্সার ঠেকানো যায়। • বিয়ে-শাদী এবং প্রথম সন্তান ধারণ ৩০ বছরের আগেই সম্পন্ন করতে হবে • পরিমিত আহার ও হালকা ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরকে হালকা পাতলা রাখতে হবে। • শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। • ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। • অত্যাধিক সাদাস্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত সাদাস্রাব, অসময়ে রক্তস্রাব, দৈহিক মিলনের পর রক্তস্রাব এবং ঋতু বন্ধের পর হঠাৎ করে রক্ত স্রাব দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। • রোগের অতি প্রাথমিক সনাক্ত করার ও চিকিৎসার ব্যবস্হা করতে হবে। ব্রংকিওলাইটিসমুক্ত থাকুক শিশু দুই বছরের কম বয়সী শিশুদেরই ব্রংকিওলাইটিস বেশি হয়। তিন থেকে ছয় মাস বয়সে প্রকোপটা বেশি। ফুসফুসে বায়ু চলাচলের সরু নালিপথ আছে। ব্রংকিওলাইটিসে এসব জালিকার মতো ছড়িয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র বাতাস পরিবহনের নালিগুলোয় প্রদাহ হয়ে থাকে। শীতকালে সাধারণত এটি ঘটে ভাইরাস সংক্রমণের কারণে। রোগের উপসর্গ প্রথম উপসর্গগুলো সাধারণভাবে ঠান্ডা-সর্দি ধরনের যেমন—নাক বন্ধ ভাব, নাক দিয়ে জল ঝরা, সামান্য কাশি ও গায়ে গায়ে জ্বর। এসব উপসর্গ এক থেকে দুই দিন স্থায়ী হয়। কাশির প্রকোপ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। মাত্রাভেদে শ্বাসকষ্ট প্রকাশ পায় বিভিন্নভাবে— • দ্রুত, অগভীর শ্বাস • উচ্চ হারের হৃদস্পন্দন • শ্বাসের সঙ্গে ঘাড় ও বুকের নিচের অংশের মাংসপেশি দেবে যায় • নাসারন্ধ্রের দুই পাশ ওঠানামা করতে থাকে • শিশু খুব অস্থির, খিটখিটে, ক্লান্ত বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ঘুমোতে ও বুকের দুধ পানে অসমর্থ হয়ে যায় • অত্যন্ত কাহিল অবস্থায় শিশুর ঠোঁট ও নখ নীলচে বর্ণ ধারণ করে। সবকিছু বমি করে দেয়। • পানিস্বল্পতাজনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। রোগ ছড়ানোর মাত্রা অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা হাসির তোড়ে জীবাণু বাতাসে ভর করে বা ব্যবহূত টিস্যু, খেলনা প্রভৃতির মাধ্যমে অন্য ছোট শিশুতে দ্রুত ছড়াতে সক্ষম। প্রতিরোধ করা যায় যেভাবে • ঘন ঘন হাত ধুয়ে দেওয়া। • বাচ্চার ঘর ধূমপানমুক্ত রাখা। • আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে শিশুদের দূরে রাখা। কতদিন ভোগে ব্রংকিওলাইটিস থেকে সেরে উঠতে প্রায় ১২ দিনের মতো সময় দরকার। তবে মারাত্মক পর্যায়ের অসুখে ভোগা শিশুর কাশি বেশ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। সাধারণভাবে কাশি শুরুর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে অসুখের মাত্রা বেশি থাকে। পরে আস্তে আস্তে কমে আসে। প্রফেশনাল চিকিত্সা • বেশির ভাগ ব্রংকিওলাইটিস সাধারণ মাত্রার ফলে বিশেষ চিকিত্সা লাগে না • অ্যান্টিবায়োটিকসের ব্যবহার লাগে না (ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ না থাকলে) • শ্বাসকষ্ট ও পানিস্বল্পতার লক্ষণ থাকলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে • নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে • প্রয়োজনে অক্সিজেন দিতে হবে • পানিস্বল্পতা পূরণ। বাসায় চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা • বেশি বেশি পানীয়, তরল খাবার দেওয়া, অল্প পরিমাণে বারবার। • ঘরে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ। • নরমাল স্যালাইন ড্রপস এবং বাল্ব সিরিঞ্জ ব্যবহার করে খাবার ও ঘুমানোর আগে নাক পরিষ্কার রাখা। • জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। কখন চিকিত্সক দেখাবেন • দ্রুত শ্বাস নেওয়ার সময় যদি শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। • না খাওয়ার কারণে বা বমির জন্য যদি পানিস্বল্পতা দেখা যায়। • বেশি ঘুমাচ্ছে। • বেশি মাত্রার জ্বর। • প্রচণ্ড কাশি। • শিশু ভীষণ দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়লে। শিশুর ডায়রিয়া ডায়রিয়া কী ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়াকেই ডায়রিয়া বলে। পায়খানা পাতলা হওয়া অর্থাৎ মলে পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়া ডায়রিয়ার লক্ষণ। পায়খানা বারবার হলেও মল যদি পাতলা না হয় তা ডায়রিয়া নয়। ঘন ঘন পায়খানা অর্থাৎ পায়খানা সংখ্যায় বেড়ে যাওয়া, সাধারণত: ২৪ ঘণ্টায় তিন বা তারও বেশিবার পায়খানা হলে তাকে ডায়রিয়া বলা হয়। মনে রাখতে হবে, শুধু মায়ের দুধ পান করে এমন শিশু অনেক সময় দিনে ৫-১০ বার পর্যন্ত পায়খানা করতে পারে, যা পেস্টের মতো সামান্য তরল হয়, একে কখনো ডায়রিয়া বলা যাবে না। শিশু যদি খেলাধুলা করে, হাসিখুশি থাকে এবং পায়খানার রং ও গন্ধ স্বাভাবিক থাকে তাহলে এর জন্য কোনো চিকিত্সার প্রয়োজন হয় না। কোন বয়সে ডায়রিয়া বেশি হয় ছয় মাস থেকে দুই বছরের শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি। তবে ছয় মাসের কম বয়সী যেসব শিশু বুকের দুধের পরিবর্তে গরুর দুধ বা গুঁড়া দুধে অভ্যস্ত এবং বোতলে বা ফিডারে শিশুকে খাওয়ানো হয়, তাদের মধ্যে ডায়রিয়া বেশি হয়। সাধারণভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। শিশুর দাঁত ওঠার সঙ্গে ডায়রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে দাঁত ওঠার সময় শিশুর দাঁতের মাঢ়ি শিরশির করে বলে যেকোনো জিনিস কামড়াতে চায়, এ সময়ে লক্ষ না রাখলে শিশু এটা-ওটা মুখে দেয়, এতে রোগজীবাণু প্রবেশ করেও পেটের অসুখ ঘটায়। ডায়রিয়ার ধরন অসুখের মেয়াদ অনুযায়ী। তীব্র ডায়রিয়া: হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তবে কখনো ১৪ দিনের বেশি সময় নয়। দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া: শুরু হওয়ার পর ১৪ দিন অথবা তারও বেশি সময়, কখনো কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। জলীয় ডায়রিয়া: মল খুবই পাতলা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে একেবারে পানির মতো। মলে কোনো রক্ত থাকে না। আমাশয় বা ডিসেন্ট্রি: মলে রক্ত থাকে, যা চোখে দেখা যায়। নতুন ধারণা মতে, মলে আম রয়েছে কি না তা ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেন হয় রোগজীবাণু খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে ডায়রিয়া ঘটায়। এ ছাড়া খাদ্য বা পানীয় বস্তু, অপরিষ্কার হাত, গ্লাস, চামচ-বাসনপত্র বা সচরাচর ব্যবহূত অন্য জিনিসপত্র, মল, মাছি ইত্যাদির মাধ্যমেও ডায়রিয়া হয়। কোন শিশুদের ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে শিশু পুষ্টিহীন হলে। বিশেষ করে যারা হাম, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। কেননা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ডায়রিয়ার পরিণতি তাত্ক্ষণিক পানিস্বল্পতা এবং সময়মতো তার সুচিকিত্সা না হলে অনিবার্য মৃত্যু। শিশু সেরে উঠলেও পরবর্তী সময়ে অপুষ্টিজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। পানিস্বল্পতা কী সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি ও লবণজাতীয় পদার্থ শরীরে না থাকলে তাকে পানিস্বল্পতা বলে। ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে পানি ও লবণজাতীয় পদার্থ শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। এ ছাড়া অধিক পরিমাণ বমির মাধ্যমে শরীর তরল পদার্থ এবং লবণ হারাতে পারে। শরীরের এই ক্ষতি যথাযথভাবে পূরণ না হলে স্বাভাবিকভাবেই পানিস্বল্পতা দেখা দেয়। পানিস্বল্পতার নানা উপসর্গ প্রথম দিকে কেবল পিপাসা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু শরীরে পানির ঘাটতি বৃদ্ধি পেলে পিপাসা, অস্থির ও উত্তেজিত ভাব, চামড়া ঢিলে হয়ে যাওয়া, মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া, ছোট শিশুদের মাথার চাঁদি বসে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। মারাত্মক পানিস্বল্পতার ক্ষেত্রে এগুলো ছাড়াও রোগীর মধ্যে পানির অভাবজনিত শক নিয়ে রোগী প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। তার প্রস্রাব কমে যায় এবং হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। দ্রুত পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা না নিলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। শিশুর শরীরে কতটুকু পানিস্বল্পতা বা ঘাটতি আছে তা নির্ণয় করা ও সে অনুযায়ী চিকিত্সা করতে হবে। ডায়রিয়ার সময় শিশুর শরীর থেকে পানি ও জলীয় অন্যান্য পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে পানিস্বল্পতা দেখা দেয়। ডায়রিয়ার তীব্রতা অনুসারে এই পানিস্বল্পতার পরিমাণ বিভিন্ন স্তরের হতে পারে। শিশুর অবস্থা লক্ষ করে, পিপাসা দেখে এবং শিশুর পেটের ত্বক ধরে ছেড়ে দিয়ে এই স্তরসমূহ নির্ণয় করে শরীরে পানির ঘাটতির অবস্থান বোঝা যায়। কীভাবে বুঝবেন শিশুর পানিস্বল্পতা নেই শিশুকে লক্ষ্য করুন  যে তার মধ্যে এই লক্ষণগুলো আছে কি না • অবস্থা ভালো ও সজাগ থাকা, চোখ স্বাভাবিক থাকা, • চোখের পানি স্বাভাবিক, মুখ ও জিহ্বা ভেজা • পিপাসা—স্বাভাবিকভাবে পানি পান করে, তৃষ্ণার্ত নয় • পেটের ত্বক ধরে ছেড়ে দিলে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায় চরম পানিস্বল্পতা হয়েছে কীভাবে বুঝবেন শিশুকে লক্ষ্য করুন  যে তার মধ্যে এই লক্ষণগুলো আছে কি না • অবসন্ন, নেতিয়ে পড়া, অজ্ঞান কিংবা ঘুমঘুম ভাব। • চোখ বেশি বসে গেছে এবং শুকনো। চোখের পানি নেই। • মুখ-জিহ্বা খুব শুকনো। পানি পান করতে কষ্ট হয় কিংবা একেবারেই পারে না। • পেটের ত্বক ধরে ছেড়ে দিন খুব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়। রোগীর দেহে এসবের মধ্যে দুই বা ততধিক লক্ষণ থাকলে তবে শিশু ‘চরম পানিস্বল্পতা’ স্তরে আছে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্যাকেট স্যালাইন শরবত তৈরির পদ্ধতি • প্রথমে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে। • আধা লিটার বা আধা সেরের চেয়ে বেশি পানি ধরে এমন একটি পাত্র এবং আধা লিটার বা আধা সের মাপা যায় এ রকম একটি গ্লাস বা অন্য কোনো পাত্র পানি দিয়ে ভালোমতো পরিষ্কার করে নিন। • স্যালাইন প্যাকেটের ওপরের অংশ কেটে সবটুকু গুঁড়া স্যালাইন তৈরির জন্য পরিষ্কার পাত্রের মধ্যে এমনভাবে ঢেলে নিন যাতে প্যাকেটের মধ্যে দানা না থাকে। পাত্রে আধা লিটার বা আধা সের পানি ঢেলে নিন। • স্যালাইন ভালো করে গুলে নিন, যাতে কোনো তলানি না থাকে। • সাধারণত: সঠিকভাবে তৈরি করা স্যালাইনের স্বাদ হয় চোখের পানির মতো, নিজে খেয়ে নিন তৈরি করা স্যালাইনের স্বাদ কেমন হলো। কীভাবে লবণ-গুড় বা লবণ-চিনির শরবত তৈরি করতে হয় • প্রথমে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। • আধা লিটার বা আধা সেরের চেয়ে বেশি পানি ধরে এমন একটি পাত্র এবং আধা লিটার বা আধা সের মাপা যায় এমন একটি গ্লাস বা অন্য কোনো পাত্র পানি দিয়ে ভালোমতো পরিষ্কার করে নিন। • শরবত বানানোর পাত্রে আধা লিটার বা আধা সের খাবার পানি মেপে নিন এবং তাতে তিন আঙুলের প্রথম ভাঁজের এক চিমটি লবণ দিন। • এক মুঠো গুড় বা চিনি পানির মধ্যে দিন এবং ভালো করে মেশান, যেন কোনো তলানি পাত্রের নিচে জমা না থাকে। • মিশ্রণ চেখে দেখুন, যদি চোখের পানির চেয়ে তা বেশি লবণাক্ত হয়, তবে ওই মিশ্রণ ফেলে দিয়ে পুনরায় কম লবণাক্ত শরবত তৈরি করুন। তৈরি করা খাবার স্যালাইন কতক্ষণ রাখা যায় প্যাকেট থেকে তৈরি করা খাবার স্যালাইন ১২ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। ১২ ঘণ্টা পর যদি তৈরি করা স্যালাইন অবশিষ্ট থাকে তবে তা ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন তৈরি করে খাওয়াতে হবে। কখন রোগীকে হাসপাতালে বা চিকিত্সকের কাছে পাঠাতে হবে • তিন দিনের মধ্যে রোগীর অবস্থার উন্নতি না হলে। • যদি বারবার পানির মতো পাতলা পায়খানা হতে থাকে। • যদি বারবার বমি হতে থাকে। • রোগীর যদি বারবার পিপাসা পেতে থাকে। • রোগী যদি খাওয়া বা পান করা কমিয়ে দেয় বা ছেড়ে দেয়। • মলে রক্ত দেখা দিলে। • যদি জ্বর থাকে। • রোগীর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে। এটি ডায়রিয়া রোগের মারাত্মক এক জটিলতা। যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর প্রস্রাব না হয়ে থাকে তবে অবিলম্বে তাকে নিকটবর্তী চিকিত্সাকেন্দ্রে পাঠাতে হবে। খোস পাঁচড়া অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগের নাম স্ক্যাবিস বা খোস পাঁচড়া, যা ‘সারকপটিস স্ক্যাবি’ নামক ক্ষুদ্র মাইট দ্বারা হয়। মাইট উকুনের মতো ছোট জীবাণু। স্ক্যাবিস বা খোস পাঁচড়া কোনও যৌনরোগ নয়। কীভাবে ছড়ায় যেহেতু রোগটি ছোঁয়াচে, সেহেতু খুব সহজেই পরিবারের অন্য সদস্যরা আক্রান্ত হয়। সাধারণত: একই বিছানায় শোয়া বা ঘনিষ্ঠ সহচার্যে থাকলে, একই কাপড়-চোপড় ব্যবহার করলে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। ঘনিষ্ঠ সহচার্যে থাকার ফলে মাইট আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে অন্যদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে আবার আক্রান্ত ব্যক্তির কাপড়-চোপড় ব্যবহারের মাধ্যমেও রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মাইট শরীরের বাইরে অর্থাৎ কাপড়-চোপড়, কাঁথা-বালিশ, আসবাবপত্রে ২-৩ দিন বেঁচে থাকতে পারে। রোগ চেনা যায় যেভাবে ত্বকের ওপর সোজা অথবা কালো সুতার মতো ছোট ছোট রেখা দেখতে পাওয়া যায়। এ রেখার শেষভাগে ছোট দানা অথবা পানিযুক্ত ছোট দানা থাকে। এ দানাগুলোই মাইটদের আবাসস্থল। এখানেই এরা ডিম পাড়ে। উপসর্গ এ রোগের বিশেষ এবং প্রধান উপসর্গ হল সারা শরীর চুলকানো। এ চুলকানি বিশেষত রাতের বেলায় বেশি হয়। রাতের বেলা বিছানার গরমের জন্য মাইটগুলো চামড়ার নিচে চলাচল করতে শুরু করে, ফলে রাতের বেলা বেশি চুলকানি অনুভূত হয়। চুলকানোর ফলে নখের আঁচড়ে চামড়া উঠে যায়। এজন্য শরীরে আঁচড়ের দাগও পাওয়া যায়। আক্রান্ত স্থান আক্রান্ত স্থানে দানা দেখা যায়। স্থানগুলো হল- হাতের আঙুলের ফাঁকে, কবজিতে, কনুই ও কনুইয়ের সম্মুখ ভাগে, স্তনের বোঁটায়, নাভি, তলপেট এবং যৌনাঙ্গের আশপাশে এবং শরীরের ভাঁজগুলোতে। তাছাড়া পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গের অগ্রভাগে এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের তলায়, মাথায়, ঘাড় ও গালেও দেখা যায়। জটিলতা সময়মতো চিকিৎসা না করালে চামড়া ও কিডনির নানা সমস্যা দেখা দেয়। যেমন – ‘একজিমাটাইজেশন’ অর্থাৎ চামড়া কালো ও পুরু হয়ে যায়। পানিযুক্ত ছোট দানাগুলো বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া দিয়ে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। তাছাড়া ত্বকে অনেকদিন ধরে  ইনফেকশনের কারণে কিডনির মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। প্রতিকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ পরিহার করা। আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্য যারা একই বিছানা, তোয়ালে ও কাপড়-চোপড় ব্যবহার করে, ঘনিষ্ঠ সহচার্যে থাকে, তাদের রোগের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক তাদের চিকিৎসা করতে হবে। চিকিৎসা খোস পাঁচড়ার জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ যেমন, বেনজাইল বেনজয়েট, পারমিথ্রিন, টেটমোসল ইত্যাদি রয়েছে, যা নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যবহার করলে খোস পাঁচড়া সেরে যায়। ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি কাপড়-চোপড় সিদ্ধ করে কাচতে হবে এবং বিছানো তোষক রৌদ্রে দিতে হবে। মুখ হঠাৎ বেঁকে যাওয়া একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি হয়তো দেখলেন, আপনার ঠোঁট দুটো কেমন যেন বেঁকে গেছে। আগের রাতেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, কোথাও কোন আঘাত পেয়েছেন বলেও মনে পড়ছে না। অনুভব করলেন বামপাশটা কিছুটা অবশ তবে কোন ব্যথা নেই। এদিক-ওদিক দেখে বুঝতে পারলেন এটা একটা শারীরিক সমস্যাই। আসলেই তাই, এটা এক ধরনের স্নায়ুবিক সমস্যা বা স্নায়ুরোগ যা ফেসিয়াল পলসি নামে পরিচিত। অনেক ক্ষেত্রে একে বেলস্ পলসিও বলা হয়- যখন বেলস্ সাইন পজেটিভ থাকে। আমাদের শরীরে মোট ১২ জোড়া করোটিকা স্নায়ু থাকে যার ৭ নম্বর স্নায়ু জোড়ার নাম ফেসিয়াল নার্ভ এবং এ নার্ভ বা স্নায়ুটির প্যারালাইসিস হলে বলা হয় ফেসিয়াল পলসি। কারণ এ রোগের প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ভাইরাস বা আঘাত হতে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। লক্ষণ • ঠোঁট দুটো বিপরীত দিকে বেঁকে যায়। • আক্রান্ত অংশের চোখ পুরোপুরি বন্ধ হয় না, কিছুটা বা পুরোটাই খোলা থাকে। • জিহ্বা বের করলে বিপরীত দিকে বেঁকে যায়। • পানি খাওয়ার সময় আক্রান্ত অংশের ঠোঁটের কোণা দিয়ে পানি পড়ে যায়। • শিষ দিতে পারে না। • মুখ ফুলালে বাতাস বেরিয়ে যায় এবং আক্রান্ত অংশ ফুলে না। • আক্রান্ত অংশে অনুভূতি কমে যায়। • জিহ্বার সামনের অংশে স্বাদ কমে যেতে পারে। চিকিৎসা এ ধরনের রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে যেতে পারে। সাধারণত: তিনমাস সময় লাগে সারতে। কখনও তা না সেরে জটিল হয়ে যেতে পারে এবং চিরস্থায়ী হতে পারে। তাই বিন্দুমাত্র অবহেলা না করে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে গ্রাজুয়েট (এমবিবিএস) চিকিৎসকগণ এ রোগ শনাক্ত করতে পারেন। তবে প্রথম থেকেই ফিজিক্যাল মেডিসিন বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। কারণ শুধুমাত্র ঔষুধে এ রোগ সারে না। পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি এবং নির্দিষ্ট ব্যায়াম অত্যাবশ্যকীয়। চিকিৎসকগণ রোগের সঠিক ইতিহাস জেনে এবং শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় সঠিক চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল জাতীয় ঔষুধ এবং স্টেরয়েড জাতীয় ঔষুধ বয়সভেদে নির্দিষ্ট মাত্রায় দেয়া হয়। নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে চিকিৎসা নির্ভর করে কত দ্রুত অভিজ্ঞ ও সঠিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন তার ওপর। দেরি করে এলে এ জাতীয় ঔষুধের কোন কার্যকারিতা থাকে না। ফিজিওথেরাপি • আই আর আর মুখের যে অংশের সমস্যায় তাতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ দেয়া হয়। • কুসুম গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে ছেঁক দেয়া যায়। • তিন সপ্তাহ পরে ইএসটি দেয়া হয়। • মুখের মাংসপেশীর নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত ফলপ্রসু। • স্ট্র বা পাইপ দিয়ে পানি খেতে পরামর্শ দেয়া হয় যাতে মুখের মাংসপেশীর শক্তি বাড়ে। • চুইংগাম চিবিয়ে ব্যায়াম করতে বলা হয়। • চোখ বন্ধ করতে না পারলে দিনের বেলা সানগ্লাস এবং রাতে আইপ্যাড ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয়া হয়। • সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা যে কোন রোগের জটিলতা কমায়। এ রোগ আপনা থেকে সেরে গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই চিরস্থায়ী হতে পারে। সেজন্য আইটি কার্ভ বা এসডি কার্ভ করে জেনে নেয়া যায় এ রোগের অগ্রগতি। ডেঙ্গু জ্বর: সতর্ক থাকুন ডেঙ্গু একটি ভাইরাস ভাইরাসজনিত রোগের সাধারণত: কোনো প্রতিষেধক নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত জ্বর। ভাইরাসজনিত অন্যান্য রোগের মতো এরও কোনো প্রতিষেধক নেই, টিকাও নেই। লক্ষণ অনুযায়ী চিকিত্সা দিয়ে এর মোকাবিলা করা হয়। অন্য ভাইরাল ফিভারের মতো এটিও আপনা-আপনি সেরে যায় সাত দিনের মধ্যে। তবে মূল ভয়টা হচ্ছে এর পরবর্তী জটিলতা নিয়ে। ডেঙ্গু জ্বর যদি সময়মতো যথাযথভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তবে রোগীর দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে, দেখা দেয় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী ডেঙ্গু জ্বর। কী ঘটে? সাধারণত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কোনো রোগীকে এডিস মশা কামড়ালে ডেঙ্গু ভাইরাস এডিস মশার দেহে প্রবেশ করে। সেই ভাইরাসবাহী এডিস মশা কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে ডেঙ্গু ভাইরাস তার দেহে ঢুকে পড়ে এবং আক্রান্ত হয় ওই ব্যক্তি। কাজেই ডেঙ্গু ছড়ানোর ক্ষেত্রে প্রারম্ভিক আক্রান্তকারী (যাকে প্রাইমারি বা ইনডেক্স কেস বলা হয়ে থাকে) শনাক্তকরণ ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য খুবই জরুরি। যেহেতু এডিস মশা এ রোগের বাহক, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের এলাকাজুড়ে বাড়ি বাড়ি মশা মারার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। ডেঙ্গুর লক্ষণ হঠাৎ করে জ্বর। কপালে, গায়ে ব্যথা। চোখে ব্যথা। চোখ নাড়ালে, এদিক-ওদিক তাকালে ব্যথা। দাঁতের মাঢ়ি দিয়ে রক্ত পড়া। পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়া অথবা কালো কিংবা লালচে-কালো রঙের পায়খানা, এমনকি প্রস্রাবের সঙ্গেও অনেক সময় রক্ত যেতে পারে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার খুবই মারাত্মক। মস্তিষ্কেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। খুব দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে বিশেষ পরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় চিকিত্সার জন্য। কীভাবে বুঝবেন ডেঙ্গু হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণী) জ্বর শকে চলে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অস্থিরতা, অবসন্নতা, পেটে তীব্র ব্যথা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, ত্বক কুঁচকে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, বেশি বেশি প্রস্রাব হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্র রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। পুনরায় রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। প্রচুর তরল খাওয়াতে হবে। বিশুদ্ধ পানি যথেষ্ট পরিমাণে পান করাতে হবে। সেই সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সময়মতো সঠিক ব্যবস্থাপনায় ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরও সারিয়ে তোলা যায়। বেশি রক্তক্ষরণ হলে ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা কিংবা কনসেনট্রেটেড প্লেটলেট, অথবা প্রয়োজনে পূর্ণ রক্ত-পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে চিকিত্সার প্রয়োজন হতে পারে। রোগী কেন মারা যায় অত্যধিক তাপমাত্রার জ্বরের জন্য দেহে পানিশূন্যতা দেখা দেয় দ্রুত। কোষের অভ্যন্তরীণ তরল কমে যায়, আশপাশের রক্তনালিতে চাপ পড়ে, শুরু হয় রক্তক্ষরণ। ইন্টারনাল ব্লিডিং। বেশি মাত্রায় রক্তক্ষরণ চলতে থাকলে অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট সংখ্যায় কমে যায়। প্লেটলেট কমে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না, ফলে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ আরও বাড়তে থাকে। দেখা দেয় শক সিনড্রম। শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। যথাযথ চিকিত্সা-ব্যবস্থাপনার অভাবে রোগীর দ্রুত অবনতি ঘটে। নেমে আসে অবাঞ্ছিত মৃত্যুর অন্ধকার। রক্তের কোন পরীক্ষা জরুরি রোগের লক্ষণ দেখে চিকিত্সকের পরামর্শমতো রক্তে বিশেষ অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নির্ণয়ের মাধ্যমে সাধারণত: ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়। তবে এটি কোনো নিশ্চিত পরীক্ষা নয়। সাধারণ জ্বর হলেই এটি করার দরকার নেই, কারণ এটি ব্যয়বহুল পরীক্ষা। সাধারণ জ্বর যদি উচ্চ তাপমাত্রায় (১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি) হয়, তাহলে প্রথমেই রক্তের একটি রুটিন পরীক্ষা করে অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট কাউন্ট দেখে নেওয়াটা জরুরি। যদি প্লেটলেট বা অণুচক্রিকা সংখ্যায় এক লাখের কম হয়, তাহলে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে পারেন। চিকিত্সা বেশির ভাগ ডেঙ্গু জ্বরই সাত দিনের মধ্যে সেরে যায়, অধিকাংশই ভয়াবহ নয়। প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান, বিশ্রাম ও যথেষ্ট পরিমাণ তরল খাবার। সঙ্গে জ্বর কমানোর জন্য এসিটামিনোফেন (প্যারাসিটামল) গ্রুপের ওষুধ। সাধারণ ডেঙ্গুর চিকিত্সা এ-ই। তবে ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে অ্যাসপিরিন বা ক্লোফেনাক-জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে। হেমোরেজিক বা রক্তক্ষয়ী ডেঙ্গু, যা খুবই কম হয়ে থাকে, বেশি ভয়াবহ। এতে মৃত্যুও হতে পারে। জ্বর, সঙ্গে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখামাত্র হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে বিশেষ চিকিত্সার জন্য। জ্বর কমানোর জন্য বারবার গা মোছাতে হবে ভেজা কাপড় দিয়ে। মশা কখন কামড়ায় ডেঙ্গু মশা, মানে এডিস মশা সকাল-সন্ধ্যায় কামড়ায়। মানে হলো এই, ভোরে সূর্যোদয়ের আধঘণ্টার মধ্যে এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আধঘণ্টা আগে এডিস মশা কামড়াতে পছন্দ করে। তাই এই দুই সময়ে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকবে হবে। ব্লাড কম্পোনেন্ট থেরাপি রক্তের প্লেটলেটের পরিমাণ দশ হাজারের নিচে না নামলে প্লেটলেট দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে প্লেটলেট বা অণুচক্রিকা আর ডেঙ্গু শক সিনড্রমে প্রয়োজন রক্তরস বা প্লাজমা কিংবা প্লাজমা সাবস্টিটিউট। এক ব্যাগ (২০০ মিলিলিটার) প্লেটলেট পাওয়ার জন্য পুরো চার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পড়ে। সেল সেপারেটর মেশিনের সাহায্যে অবশ্য একজন ডোনারের কাছ থেকেই এই পরিমাণ প্লেটলেট সংগ্রহ করা যায়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন -‘ভি’ ডেঙ্গু হবে না, যদি পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকি, দৈনন্দিন স্বাস্থ্য-অভ্যাস পরিবর্তন করি। ভেক্টর (এডিস মশা), ভিকটিম (রোগী), ভাইরাস (ডেঙ্গু ভাইরাস)—এই তিন ‘ভি’ ডেঙ্গু-ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এডিস মশা ডেঙ্গুর ভেক্টর বা বাহক। কাজেই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নিজের ঘর, আঙিনায় মশার উত্স ধ্বংস করুন। ফুলের টব, পুরোনো ক্যান বা পাত্র, গামলা, গাছের কোটরে যাতে চার-পাঁচ দিন পানি জমে না থাকে, ছোট আবদ্ধ জায়গায় যাতে বৃষ্টির পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। নিজেই উদ্যোগী হোন, কারও আশায় বসে থাকবেন না। মিউনিসিপ্যালিটির জন্য অপেক্ষা না করে নিজ উদ্যোগে আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। ভিকটিম, অর্থাত্ রোগীর যথাযথ চিকিত্সা করান। কোথাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পেলে আশপাশের সবাইকে তা জানান এবং এলাকার ঘরবাড়িতে বিশেষ মশকনিধন অভিযান পরিচালনা করুন। জ্বরের প্রাথমিক চিকিৎসা থার্মোমিটারে দেহের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার উপরে উঠলেই তাকে জ্বর বলা যাবে। এজন্য পরিবারের সদস্যদের জ্বর মাপার নিয়ম চিকিৎসকের কাছে জেনে নিতে হয়। জ্বরের কারণ নির্ণয়ের জন্য ছয়-আট ঘণ্টা অন্তর অন্তর জ্বরের রেকর্ড লিখে রাখা ভালো। বিভিন্ন ধরনের ফ্লুতে আমরা প্রায়শই আক্রান্ত হই। এগুলো ভাইরাস দিয়ে ছড়ায় এবং সহজেই পাশের সুস্থ ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। পরিবারে কারও জ্বর হলে স্বাভাবিকভাবেই অন্য সদস্যরা ভীত হয়ে পড়েন। জ্বরের ঘরোয়া চিকিৎসা কীভাবে নেবেন, তা এখানে উল্লেখ করা হল। জ্বর ১০১ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার উপরে হলে রোগীর পুরো শরীর স্পঞ্জিং করিয়ে দিতে হবে। প্রায় দশ মিনিট অবিরাম স্পঞ্জিং করলে তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রী ফারেনহাইট নামানো সম্ভব। স্পঞ্জিং করার সময় হালকা করে ফ্যান ছেড়ে রাখতে হবে এবং বাতাস রোগীর শরীরে যেন ডাইরেক্ট না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একটি ছোট গামছা বা রুমাল পানিতে ভিজিয়ে শরীর ভিজিয়ে দিতে হবে, অপর একটি শুকনো ছোট গামছা দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। মনে রাখবেন, যে কোনও জ্বরেই স্পঞ্জিং উপকারী এবং এভাবে প্রয়োজনে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই করা যায়। জ্বর ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার বেশি হলে সিরিয়াসলি নিতে হবে। এক্ষেত্রে রোগীর খিঁচুনি হতে পারে বা রোগী জ্ঞানও হারাতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের এটি বেশি হয়। খিঁচুনির ইতিহাস থাকলে রোগীকে চিকিৎসকের নির্দেশে ডায়াজিপাম ও ফেনারগন দিতে হয়। উচ্চমাত্রার জ্বর প্রতিরোধের জন্য যে কোন বয়সের রোগীদের বালতি বা গামলায় পানি নিয়ে তাতে চুবানো বা ভেজানোর পরামর্শ দেয়া হয়। এতে ক্ষতি হওয়ার কোনোই ভয় নেই। জ্বর বেশি বা কম মাত্রায় থাকুক না কেন গোসল করতে নিষেধ নেই। তবে নিউমোনিয়া বা শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ থাকলে গোসল না করানোই ভালো। জ্বর ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার উপরে উঠলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বা সাপোজিটরি ব্যবহার করতে হবে। দিনে সাধারণত তিনবার ট্যাবলেট ব্যবহার করা যায়। তবে যে কোন ওষুধই ডাক্তারের পরামর্শ মতো খেতে হবে। জ্বর থাকলেই তা ব্যবহার করা যায়। ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর টানা তিনদিন থাকলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের নির্দেশমতো এন্টিবায়োটিক খাবেন, নিজের খেয়ালখুশিমতো নয়। যে কোনও জ্বরে ফ্লুইড বা পানীয় খাওয়ানোর প্রতি জোর দেয়া হয়, এতে রোগীর শরীরে হাইড্রেশন হয় এবং দেহের তাপমাত্রা বের হয়ে যেতে সাহায্য করে। পেন ওয়াটার, ডাব ওয়াটার, ওরস্যালাইন, ডালের পানি, ফলের রস, কোমল পানীয় এক্ষেত্রে উপকারী। স্যুপ, দুধ, হরলিকসও খাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। এ সময় মুখ তিতা হয়ে যায় বলে ভিটামিন-সি বা টক জাতীয় ফল খাওয়া প্রয়োজন। এতে মুখের তিতা ভাব দূর হবে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। বুকব্যথায় করণীয় বুকব্যথা এবং হার্ট আমাদের বুকের অনেকটা মাঝ বরাবর হার্টের অবস্থান। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় এর গঠন সমাপ্ত হয়। সারাশরীরে নিরন্তর রক্ত পাম্প করাই এর কাজ। অর্থাৎ হার্ট শরীরে রক্ত চলাচল বা পুষ্টি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। যদি কোনও কারণে হার্ট সঠিক নিয়ম অর্থাৎ ছন্দে রক্ত পাম্প করতে না পারে, তবে রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে দেহের যে কোন অঙ্গের এমনকি হার্টের মাংসপেশিরও ক্ষতিসাধন হতে পারে। এ অবস্থায় বুকেব্যথা অনুভব হবে, তবে দীর্ঘদিনের বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক রোগীর হার্টের সমস্যায় ব্যথা নাও থাকতে পারে। তাই ডায়াবেটিসকে বলা হয় সাইলেন্ট কিলার বা নীরব ঘাতক। বুকের ব্যথা বোঝার উপায় সাধারণত যে কোনও ধরনের পরিশ্রম করলে বা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে বা এক্সারসাইজ করলে বুকে ব্যথা হয়। এ কাজ থেকে বিরত থাকলে বা পরিশ্রম কমিয়ে দিলে ব্যথা আস্তে আস্তে কমে যায়- এ থেকে হার্টের ব্যথা নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়। এ ব্যথায় আক্রান্ত রোগীর মনে হবে যেন দম আটকে আসছে বা বুকের মধ্যে ভারি ওজন কেউ দিয়ে চেপে আছে বা বুক চেপে আসছে বা মৃত্যু আসন্ন। এমন হলে বোঝা যায়, তার একিউট বা হঠাৎ অ্যাটাক হয়েছে। এ অবস্থায় নিকটস্থ চিকিৎসক বা হাসপাতালে কিংবা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। ব্যথা বুকের বাম বা ডান যে কোনও পাশে হতে পারে। অনেকের ধারণা, হার্ট দেহের বাম পাশে বেশি অংশ থাকে বলে শুধুমাত্র বামপাশে ব্যথা হলেই তা হার্টের ব্যথা- যা ঠিক নয়। এ ব্যথা রেডিয়েট বা ছড়িয়ে যেতে পারে। নিচের চোয়ালে, ডান বা বাম হাতে বা গলার কাছে ব্যথা আসতে পারে। কারও যদি উপরের যে কোনও এক বা একাধিক লক্ষণ থাকে, তবে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় তিনি হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। বুকব্যথা মানেই কি হার্টের ব্যথা বুকব্যথা আরও অনেক কারণে হতে পারে। মনে রাখবেন, এ ব্যথাগুলোর কোনওটাই মৃত্যুঝুঁকি বয়ে আনে না। তবে এর যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োজন। যেমন- • মাংসপেশি ও হাড় থেকে, শ্বাস-প্রশ্বাস বা ফুসফুসের কোনও কারণে এবং বুকের নিচে পেটের কোনও কারণে, উঠলে-বসলে, একাত-ওকাত হলে, নড়াচড়া করলে, শোয়া থেকে বসা বা বসা থেকে উঠলে যদি ব্যথা হয়, তবে ধারণা করা যায়, এটি মাংসপেশি বা হাড়জনিত কোনও ব্যথা। • শ্বাসের সঙ্গে যদি ব্যথা কম-বেশি থাকে তবে ফুসফুসের কোনও সমস্যা থেকে এ ব্যথা হতে পারে। • পেটে-বুকে জ্বালাপোড়া ভাবের সঙ্গে ব্যথা কিংবা খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যেমন- খালি বা ভরা পেটে ব্যথা হলে বা বুকের মাঝখানে জ্বালা থেকে ব্যথা হলে ধরে নেয়া যায় এটি খাদ্যনালী বা পাকস্থলীজনিত কোনও ব্যথা। তবে হার্টজনিত ব্যথাই সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ এ থেকে মৃত্যুঝুঁকি থাকে, তাই একে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারা হার্টের ব্যথায় আক্রান্ত হতে পারে • যাদের বয়স ৪০-এর ওপর। • মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের সাধারণত হার্টের সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। • যারা ধূমপায়ী। ধূমপান রক্তনালীর দেয়াল পুরু করে রক্তনালী চিকন করে দেয়। ফলে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে। • যাদের অনিয়ন্ত্রিত বা বেশি মাত্রায় ডায়াবেটিস আছে। • যাদের উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন আছে। • যাদের রক্তে উচ্চমাত্রায় কলেস্টেরল আছে। • যারা ব্যায়াম করেন না। • যারা অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত। • যাদের ফিজিক্যাল একটিভিটি কম। তবে এ ফ্যাক্টর বা ফ্যাক্টরগুলো না থাকলেও কারও হার্টের সমস্যা হতে পারে। যেভাবে হৃদরোগ শনাক্ত করা হয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীকে পরীক্ষা করেন এবং রোগের লক্ষণ ও ইতিহাস জেনে হৃদরোগ নির্ণয় করে থাকেন। এক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষারও প্রয়োজন হয়ে থাকে। যেমন- ইসিজি - এটি কোনও সূক্ষ্ম পরীক্ষা বা কনফারমেটরি টেস্ট নয়। প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ে ইসিজি সাহায্য করে। এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্ট বা ইটিটি - এর সাহায্যে হার্টের কন্ডিশন বা পারফরমেন্স ভালোভাবে জানা যায়। করোনারি এনজিগ্রাম - এর সাহায্যে হার্টের রক্তনালীগুলো কী অবস্থায় আছে অর্থাৎ চেপে গেছে কিনা বা ব্ল¬ক আছে কিনা তা বোঝা যায়। রক্তনালী বেশি চেপে গেলে বেলুন করে রিং লাগানো হয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া আরও কিছু রুটিন টেস্টের দরকার হয়। হৃদরোগ কি প্রতিরোধ করা যায়? হৃদরোগ অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। এ জন্য যা করতে হবে তা হল- • ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। • উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। • ডায়াবেটিস পূর্ণমাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। • রক্তের কলেস্টেরলের মান স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে হবে। • নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস করতে হবে। হঠাৎ বুকে ব্যথা হলে কী করবেন প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে, এটি হৃদরোগজনিত ব্যথা কিনা। এ জন্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে অবশ্যই কনসাল্ট করতে হবে। হার্টের কারণে ব্যথা হলে রক্ত সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য নাইট্রেট জাতীয় ওষুধ যেমন নাইট্রোগ্লিসারিন জিহ্বার নিচে দিলে হার্টে রক্ত সরবরাহ সাময়িকভাবে বাড়ানো যায়। মনে রাখবেন, হঠাৎ কারও এ সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহার করা ঠিক হবে না। অনেকে এ অবস্থায় নিজে থেকে অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খেয়ে নেন। পেটের সমস্যা থেকে এ ব্যথা হলে অ্যাসপিরিনে হিতে বিপরীত হবে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ ডাক্তার বা হাসপাতালে যেতে হবে। হৃদরোগের চিকিৎসা এর চিকিৎসায় প্রথমেই প্রতিরোধের উপায়ের দিকে নজর দিতে হবে। হার্টডিজিজের রোগীদের দীর্ঘসময় এমনকি আজীবন এসপিরিন বা ক্লোপেডিগ্রিল জাতীয় ওষুধ খেতে বলা হয়। এসপিরিনে কারও কারও এসিডিটির সমস্যা দেখা দিলে এন্টিআলসারেন্ট ওষুধ খেতে হয়। এছাড়া হেপারিন জাতীয় ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে। এ ওষুধ বাংলাদেশের সর্বত্র এমনকি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য ওষুধের সাহায্যে হৃদরোগের চিকিৎসা করা হয়। টাইম ইজ মাসেল হৃদরোগ চিকিৎসায় একটি বহুল ব্যবহৃত বাক্য আছে, তা হল টাইম ইজ মাসেল। অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর বা ব্যথা শুরু হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যাওয়া যাবে তত হার্টের মাংসপেশির নেক্রোসিস বা ক্ষয় হওয়া রোধ করা যাবে। বলা হয় ৬-১২ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যেতে হয়। দুধ সংরক্ষণ পদ্ধতি পুষ্টির প্রায় সব উপাদান সঠিক পরিমাপে উপস্থিত থাকে বলে দুধকে সবচেয়ে পুষ্টিকর ও সমৃদ্ধ পানীয় হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। পানীয়ের মধ্যে দুধই উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠ পানীয়। দুধ আদর্শ খাদ্য কেন? ‘দুধ একটি আদর্শ খাবার’ কারণ, • দুধে পুষ্টি উপাদানগুলোর উপস্থিতি অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় অনেক বেশি। • দুধের ক্যালসিয়াম মজবুত হাড় গঠনে সাহায্য করে। • পেশির সচলতা বাড়ায় এবং রক্তকণিকা তৈরিতেও ক্যালসিয়ামের ভূমিকা অনেক। • মস্তিষ্কের গঠন ও পেশি গঠনে দুধের প্রোটিন সরাসরি ভূমিকা পালন করে। • দুধে আছে ভিটামিন-এ যা দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি ও চর্ম গঠনে কাজ করে। • শরীরের কোষের স্বাভাবিক বিভাজন করেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। • ভিটামিন-বি১২ এবং রিবোফ্লাবিন হৃৎপিণ্ডের সুস্থতা ও শক্তি বৃদ্ধিতে দরকার। • স্নায়ুকোষের সঠিক বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়। দুধের রকমভেদ ও খাদ্য উপাদান দুধের গুণগত মান এই খাদ্যগুণগুলোর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। গরুর রকমভেদে তা বিভিন্ন হতে পারে। বছরের বিভিন্ন ঋতুতে দুধের ধরন ভিন্ন হয় এবং গরুর খাবারের ওপরও দুধের খাদ্য মান বা গুণগত মান নির্ভর করে। আমাদের দেশের মানুষ এখনও দুধওয়ালা বা গোয়ালার কাছ থেকে অপরিশোধিত কাঁচা দুধ কিনে খায়, যা অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদ নয়। কেননা গোয়ালাদের দুধ সংগ্রহ পদ্ধতি স্বাস্থ্যসম্মত নয়, তাদের গোয়াল ঘরের পরিবেশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরিচ্ছন্ন থাকে। দুধের মধ্যে অনেক সময় গোচনার ছিটা, গাভীর গায়ের ময়লা, পশম ইত্যাদি পড়ে। তাছাড়া গোয়ালা গরু থেকে সংগ্রহ করে ধাতব পাত্রে বা বোতলজাত করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয় এবং এই প্রক্রিয়ায় দুধে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অনেক সময় এই পাত্রগুলো ঠিকমত পরিষ্কার না করেই পাত্রে বা বোতলে দুধ বাজারজাত করে যা স্বাস্থ্যকর নয়। দুধ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত পদ্ধতি সনাতন পদ্ধতিতে খোলা দুধ পরিশোধন করার জন্য উচ্চতাপে একাধিকবার ফুটানো হয় যাতে করে দুধের গুণগত পুষ্টিমান নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া অনেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান এবং প্রোটিনের গুণগতমান নষ্ট হয়ে যায়। বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াকৃত তরল দুধ কম তাপে পাস্তুরায়ন করা হয়, যাতে দুধের গুণগত পুষ্টিমান অটুট থাকে। এটা সাধারণত দুইভাবে করা হয়। যেমন- স্বল্প সময় সংরক্ষণের জন্য পাস্তুরায়ন এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য ইউএইচটি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ। পাস্তুরায়ন: পাস্তুরায়নের অন্য অসুবিধা হচ্ছে এটি ফ্রিজিং না করলে নষ্ট হয়ে যায় এবং পাস্তুরিত দুধ ফুটালে এর পুষ্টিগুণ হ্রাস পায়। আর এই দুধ প্লাস্টিকের প্যাকেটে প্যাকেটজাত করা হয় বলে সূর্যের আলোতে তা নষ্ট হয়ে যায়। ইউএইচটি পদ্ধতি: আধুনিক প্রযুক্তির সময় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও অনেক আধুনিকায়ন ঘটেছে। দুধকেও ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করার আধুনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেটি ইউএইচটি পদ্ধতি। ইউএইচটি পদ্ধতিতে দুধকে পুরোপুরি ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করা যায় এবং দুধের সব পুষ্টি উপাদান অক্ষুণ্ন থাকে এবং এই দুধে কোন প্রিজারভেটিভ থাকে না। ইউএইচটি বা আল্ট্রা হাই টেম্পারেচারের মাধ্যমে দুধ প্রক্রিয়াজাত করলে ফ্রিজে সংরক্ষণ না করেও দুধ চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত রেখে দেওয়া যায়। দুধ কেনার পর ফুটানোর কোনো দরকার হয় না এবং এই দুধে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ছয়স্তর বিশিষ্ট টেট্রাপ্যাকের বিশেষ প্যাকেটে এই দুধ বাজারজাত করা হয়, এই প্যাকে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম স্তর যা দুধকে সূর্যের আলো, বাতাস ও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। এর ফলে এই দুধ সংরক্ষণ ও বহনও অনেক বেশি সুবিধাজনক। সঠিক আহার আনে সুনিদ্রা অনিদ্রা হয় অনেকেরই। আর সুনিদ্রার জন্য মানুষের চেষ্টারও শেষ নেই। অনেকে কড়িকাঠ গুনে গুনে রাত পার করেন—ঘুম আসে না চোখে। তবে পুষ্টি যদি সঠিক হয় তাহলে অনিদ্রা ঠেকানো যায়, এমন কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। বিকেল বা সন্ধ্যাবেলা ঠিকমতো খাওয়া আর সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, কী কী খাবার পরিহার করা উচিত তা জেনে সেগুলো এড়ানো—এভাবে আসতে পারে সুনিদ্রা। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কী কী খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ না করা উচিত? ক্যাফিন বর্জন করুন পরিহার করুন ক্যাফিনযুক্ত পানীয় ও খাদ্য। কফি, চা, কোমল পানীয়, চকলেট—শুতে যাওয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে এসব গ্রহণ করা অনুচিত। ক্যাফিন এমন এক প্রকৃতিজাত রাসায়নিক, যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে; মানে হলো, এটি স্নায়ুতন্ত্র ও ভাবনার সূত্রকে উজ্জীবিত করে। যারা ক্যাফিনের প্রতি সংবেদনশীল, এদের ক্ষেত্রে এমন উদ্দীপনা সুখকর হয় না। ঘুমের আগে আগে চা-কফি পান করলে অনিদ্রা হতে পারে। যারা সংবেদনশীল, তাদের ঘুমাতে যাওয়ার আধঘণ্টা আগে থেকে এসব পানীয় পান বর্জন করা উচিত। মদ্যপান করবেন না মদ্যপান বর্জনীয় হলেও অনেকে লুকিয়ে করেন—ঘরে, বাইরে, ক্লাবে। অনেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও পান করেন শিথিল হওয়ার জন্য, মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে তাঁদের। কালক্রমে মদ্যপানে নিদ্রা অশান্তির কারণ হয়, অস্বস্তি হয়, অনিদ্রা হয়ে ওঠে সঙ্গী। তাই মদ্যপান বর্জন করাই শ্রেয়। পেটভরে আহার নয় ঘুমাতে যাওয়ার আগে আগে অতিভোজন বা পেটভরে আহার বা বড় নাশতা খেলে ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু হয়, কিন্তু সত্যিকারের ঘুম আসে না। বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা যখন করা হয়, তখন পরিপাক হয়ে যায় শ্লথগতি, খুব অস্বস্তি লাগে, ঘুম আর আসবে না। তাই রাতের খাবার যা খাবেন, এতে যেন ৬০০ ক্যালরির বেশি না থাকে। আর খেতে হবে ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে। ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দেড় ঘণ্টা আগলা পর্যন্ত তরল পান করা যাবে। এ বড় গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। যারা মধ্যরাতে ঘুম থেকে জেগে টয়লেটে যান, এঁদের জন্য পরামর্শ হলো, শুতে যাওয়ার ৯০ মিনিট আগ পর্যন্ত তরল পান করে নিন। এরপর আর না করাই ভালো। ওষুধ খাওয়ার জন্য পান করতেই হয় তাহলে বড়ি গেলার জন্য চুমুকে পানি পান করুন। ওষুধ খেতে যদি গ্লাসভর্তি পানি পান করতে হয়, তাহলে সম্ভব হলে সন্ধ্যাবেলা সে ওষুধ খেলে ভালো। দেখুন, এ রকম চর্চা করে ঘুম আসে কি না। শীতে শিশু থাকুক নিউমোনিয়ামুক্ত আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুর মৃত্যুর হার অনেক বেশি। এর প্রথম কারণ নিউমোনিয়া। এই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হলে শিশুরা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে মারা যায়। প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৪০ লাখ শিশু এই রোগে মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ প্রতি ১৫ সেকেন্ডে একজন শিশু মারা যায়। নিউমোনিয়ার লক্ষণ • কাশি, শ্বাসকষ্ট, জ্বর • দ্রুত নিঃশ্বাস • পাঁজরের নিচের অংশ ভেতরের দিক দেবে যাওয়া। ওপরের লক্ষণগুলোর সঙ্গে শিশু খেতে না পারলে, বুকের ভেতর শব্দ হলে, শিশু নিস্তেজ হয়ে গেলে এবং খিঁচুনি হলে বুঝতে হবে, শিশু মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এ ক্ষেত্রে শিশুকে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিতে হবে। তবে সাধারণ সর্দি, কাশি বা নাক বন্ধ থাকলে বাড়িতেই তার চিকিত্সা করা সম্ভব। নরম কাপড় দিয়ে নাক পরিষ্কার করে দিন, জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল সিরাপ দিন এবং কাশির জন্য ঘরে তৈরি লেবু বা আদা বা তুলসীপাতার রসের সঙ্গে মধু মিলিয়ে খেতে দিন। তবে কাশির মাত্রা বেশি হলে চিকিত্সকের কাছে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব সর্দি-কাশি নিউমোনিয়া নয় এবং এন্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন নেই। কারা নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয় • যাদের বয়স দুই বছরের নীচে • যারা অপুষ্টিতে আক্রান্ত • যারা বুকের দুধ পান করেনি, বিশেষ করে শালদুধ • যাদের হাম, টিবি, ডিপথেরিয়া, বিশেষ করে নিউমোনিয়ার টিকা দেওয়া হয়নি • যেসব শিশু বদ্ধঘরে ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে থাকে • যাদের সামনে অন্য ব্যক্তিরা ধূমপান করে • গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুরা সে জন্য বেশি আক্রান্ত হয়, যার প্রধান কারণ ঘনবসতি ও বায়ুদূষণ। নিউমোনিয়া প্রতিরোধের উপায় • জন্মের পর এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ দিন এবং ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করান। • বারবার হাত ধোবেন, বিশেষ করে শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে। • ঘরে, বিশেষ করে শিশুর সামনে ধূমপান করবেন না। • রান্নাঘর ও শোয়ার ঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখুন, যাতে করে রান্নার ধোঁয়া ঘরে আটকে না থাকে। • এক বছরের মধ্যে সময়মতো শিশু সব টিকা, বিশেষ করে নিউমোনিয়ার টিকা দিন। • আমাদের শিশুকে একটা সুন্দর জীবন উপহার দিতে, আসুন, আমরা সবাই চেষ্টা করি। গর্ভকালীন মা ও শিশুর পরিচর্যা বিষয়ে সচেতনতামূলক তথ্য • পোয়াতি বা গর্ভবতী নারীকে দুশ্চিন্তা বা মন খারাপ করার মত কথা বলা ঠিক নয়। • গর্ভবতী নারীর মন খারাপ হলে শরীর খারাপ হবে, তাতে তার ও তার পেটের শিশুর ক্ষতি হতে পারে। • এ সময়ে মেয়েরা নিজেকে খুব অসহায় ভাবে। স্বাভাবিক চলাফেরা বা অনেক কাজ করতে পারে না, এর জন্য স্বামী বা পরিবারের অন্যদেরকে তার অসুবিধাটুকু বুঝতে হবে। তাকে সহযোগিতা করতে হবে, সাহস দিতে হবে, ভাল গল্প করতে হবে, তাকে হাসিখুশি রাখতে হবে। • পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খাওয়া বা একবেলা বেশি খাবার খাওয়া প্রয়োজন। • দিনে অন্তত: ১ ঘন্টা করে বিশ্রাম ও রাতে ৭-৮ ঘন্টা তার ঘুমানো দরকার। • গর্ভকালীন সময় নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরী। • আটশাট কাপড় না পরা, পোশাক ও বিছানাপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার। • গর্ভধারণের ৪-৮ মাসের মধ্যে ১ মাসের ব্যবধানে দুটি টিটি ইনজেকশন দিতে হবে। • ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মধ্যে যদি ৫ ডোজ টিটি ইনজেকশন নেওয়া থাকে তাহলে আর টিটি নিতে হয় না। আজীবন ধনুষ্টংকার থেকে নিজেকে ও গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষা করা যায়। • কন্যা সন্তান গর্ভে আছে জেনে গর্ভবতীকে অবহেলা করা যাবেনা, কারণ তাতে পেটের শিশুটি অসুস্থ হয়ে জন্ম নিতে পারে, তাতে পরিবারেরই ক্ষতি। গর্ভবতী নারীও সারাজীবন অসুস্থ হয়ে পরিবারের ও সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে, নয়তো অকালে মারা যাবে। • কন্যা শিশুরাও সঠিক শিক্ষা এবং কারিগরী শিক্ষা পেলে আয় উপার্জন করে সংসারে সুখ ও সফলতা আনতে পারে। গর্ভবতীর দাঁতের যত্ন গর্ভবতীদের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে দাঁত ও মাড়ির সমস্যা অন্যতম। এ সময় দাঁতের মাড়ি ফুলে লাল হয়ে যায়। মাড়িতে ব্যথা হয়, দাঁত দিয়ে রক্ত পড়ে, মুখে-দুর্গন্ধ হয়, পুঁজ পড়ে, দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, দাঁতের গোড়ায় পাথর জমে, টিউমার সিস্ট, দন্তক্ষয়সহ বিভিন্ন ধরনের দাঁত ও মাড়ির অসুখে গর্ভবতীরা আক্রান্ত হতে পারেন। মনে রাখবেন, শিশুর গঠন প্রক্রিয়া গর্ভবতীর ছয় সপ্তাহ গর্ভাবস্থা থেকে শুরু হয়। • মাড়ির জন্য প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি জাতীয় খাদ্য খাওয়া উচিত। এটি মাড়ি মজবুত করে এবং মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করে। • এছাড়া খাদ্য তালিকায় ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাসসমৃদ্ধ খাদ্য রাখা উচিত। • অতিরিক্ত ভিটামিনেও শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। • গর্ভাবস্থায় ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খেতে হবে। • সাধারণত: গর্ভবতী মায়ের জিহ্বায় সাদা সাদা ক্ষত দেখা যায় এবং আক্কেল দাঁতের সমস্যাও পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং সর্বদা মাড়ি পরিষ্কার রাখতে হবে এবং ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দু'বেলা দাঁত ব্রাশ এবং সেইসঙ্গে জিহ্বাবেলা দাঁত ব্রাশ এবং সেইসঙ্গে জিহ্বা পরিষ্কার করতে হবে। • ব্রাশ যেসব জায়গা পরিষ্কার করতে পারে না সেসব জায়গায় ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া প্রতিদিন ঘুমানোর আগে কুসুম লবণ পানিতে কুলি করতে হবে। লক্ষ্যণীয়: গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস এবং শেষ তিন মাস মুখ ও দাঁতের চিকিৎসা না করাই ভাল। এ সময়ে যে কোন ধরনের এক্সরে পারতপক্ষে না করাই ভাল। টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তা না হলে গর্ভের শিশুর দাঁত সাদার পরিবর্তে হালকা বাদামি ও ছোগ ছোগ দাগ দেখা দিতে পারে। মুখ ও দাঁতের যে কোন ব্যথা হলে ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নিতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান করুন, সুস্থ থাকুন • নিরাপদ বা বিশুদ্ধ পানি পান করুন, আর্সেনিক মুক্ত টিউবওয়েলের পানি (বন্যায় যে টিউবওয়েল ডুবেনি) পান করুন । • কুয়ো, নদী, পুকুরের পরিষ্কার পানি ১০-১৫ মিনিট টগবগিয়ে ফুটিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। • পানিশোধক ট্যাবলেট ২ লিটার পানিতে গুলিয়ে ৩০ মিনিট পর ছেঁকে পান করতে হবে। • ফিল্টার মেশিনে পানি জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। • এক কলসি পানিতে (১০ লিটার পানি) ১ চা চামচ গুড়া ফিটকারি ভালোভাবে মিশিয়ে ১ ঘন্টা পর কলসির ওপরের পরিষ্কার পানি পান করতে হবে। • ২৫ লিটার পানিতে ১ চা চামচের চারভাগের একভাগ টাটকা ঝরঝরে শুকনো ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে ৩০ মিনিট পর সেই পানি রান্না, ধোয়া, শিশুদের গোসল ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতে হবে। • অধিকাংশ রোগ জীবাণু পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকে রোগ-বালাই বাধায়, যেমন- কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিস ‘এ’ ও হেপাটাইটিস ‘ই’ কৃমি রোগ ইত্যাদি। • অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে অপরিষ্কার যন্ত্রপাতি ও পানি দিয়ে তৈরি আখের রস খেয়ে পানির তৃষ্ণা মেটাতে গেলে রোগ বালাই হতে পারে। • যে পাত্রে পানি রাখবেন তা ২ দিন পর পর ভাল করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। বেশিদিন ধরে রাখা বোতল, কলসি কিংবা অন্য যে কোনো পাত্রের পানি খাওয়া কিংবা ব্যবহার করা ঠিক নয়। • এলাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকলে স্থানীয় প্রশাসন, চেয়ারম্যান, মেম্বারকে জানান। পাড়া, মহল্লায় নিজেরা মিলেমিশে দীঘি, গভীর কুয়ো কিংবা নলকুপ তৈরি করে নিতে হবে। • গোসলের পানি বা নানা রকম কাজে ব্যবহার করা নোংরা পানি ফেলার জন্য বাড়ির পেছনে বড় করে গর্ত করে নেওয়া যায়, তাতে কিছুদিন পর পর ব্লিচিং পাউডার, ফিনাইল ছিটিয়ে দিলে রোগ জীবাণু ছড়াবে না। • গোসলখানা ও পায়খানা-প্রস্রাবখানার পানি যেন নিজের কিংবা প্রতিবেশির বাড়িতে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার না করলে সারা বছর রোগ বালাই লেগেই থাকবে। • শিশু ও বুড়োদের পায়খানা-প্রস্রাবও যেখানে সেখানে ফেলবেন না বা করাবেন না। কারণ তাতেও রোগ-জীবাণু ছড়ায়। • পায়খানা থেকে এসে সাবান কিংবা ছাই দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। শিশুর দেরিতে কথা বলা: করণীয় সাধারণত: জন্মের ২৮ সপ্তাহ বা ৬ থেকে ৭ মাস পর থেকেই শিশু দা, বা, কা, চা প্রভৃতি আধো বুলি না বুঝেই আওড়াতে থাকে। বিপরীতে অক্ষরের পিঠে অক্ষর জুড়ে দাদা, বাবা, কাকা, মামা প্রভৃতি শব্দ অর্থ না বুঝেই বলে। শিশুরা কিন্তু কথা বলা শেখার আগেই বুঝতে শেখে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তারা নিজের মনের কথা প্রকাশ করে। যেমন: কোলে উঠতে চাইলে দুই হাত উঁচু করা, কিছু নিতে না চাইলে হাত থেকে ফেলে দেয়া ইত্যাদি। তবে সাধারণত: এক বছরের মাথায় বা ১২ থেকে ১৮ মাসের দিকে শিশু একটি শব্দে কথা বলা শুরু করে। কিন্তু কোনও বাচ্চা যদি এর মধ্যেও কথা বলা শুরু না করে তবে তা অস্বাভাবিক বুঝতে হবে। কেন এমন হয়? অনেক বাচ্চা এমনিতেই স্বাভাবিক সময়ের কিছু পরে অর্থাৎ ১৩ থেকে ১৪ মাস থেকে কথা বলা শুরু করে। • বংশগত কারণেও দেরিতে কথা বলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। • মস্তিকের জন্মগত ত্রুটি। • প্রসবকালীন জটিলতা। • প্রসবোত্তর স্বল্পকালীন অসুখ যেমন: কঠিন জ্বর, খিঁচুনি, জীবাণু, সংক্রমণ, মস্তিকের ভেতর জীবাণু সংক্রমণ ইত্যাদি শিশুর কথা বলায় অন্তরায় হতে পারে। • জিহ্বার ত্রুটির কারণে অনেক শিশু ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। • শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। অনেক সময় দেখা যায় বড়রা শিশুর সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেন না। ফলে শুনে শুনে বাচ্চারা ভুল উচ্চারণ শিখে থাকে। • শিশুর মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে অর্থাৎ বুদ্ধির মাত্রা কম হলেও শিশু দেরিতে ভাষা শেখে। • শিশুর সামনে ঝগড়া বা উচ্চারণ বেশি মাত্রায় করলে তাদের কথা জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। করণীয় • বাচ্চার সামনে শুদ্ধ উচ্চারণে বেশি বেশি করে কথা বলুন। • শিশুর বেড়ে উঠার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যেন অনুকূলে থাকে সেদিকে নজর দিন। • শিশুর মানসিক অস্থিরতা দূর করতে সহযোগিতা করুন। • বাচ্চা ভুল উচ্চারণ করলে খুশি না হয়ে তৎক্ষণাৎ শুধরে দিন। • মা-বাবারা যতটা সম্ভব বাচ্চার সঙ্গে সুন্দর সময় কাটান। • বাচ্চা যেন হীনমন্যতায় না ভোগে, নিজেকে অসহায়, একা না ভাবে। • গান বা কবিতা বা গল্প শুনিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়ান। নারীর জন্য টিটি টিকা একজন নারীর ১৫ থেকে ৪৯ বছরের যেকোন সময় টিটেনাস টক্সয়ড (টিটি) টিকা দেওয়া যায়। টিটি টিকার পাঁচটি ডোজ। নির্দিষ্ট সময়ে এই পাঁচটি ডোজই পূরণ করতে হয়। প্রতিবার এই টিকার ডোজ দিতে হয় দশমিক ৫ এমএল করে ইনজেকশনের মাধ্যমে। বাহুর ওপরের অংশের মাংসপেশিতে এই টিকা দেওয়া হয়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও এতে করণীয় ইনজেকশন দেওয়া স্থানে লালচে গোটা হয়ে ফুলে যেতে পারে। ব্যথা থাকে, জ্বলে। অনেকেরই জ্বর চলে আসে। জ্বর দুই দিন স্থায়ী হতে পারে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। দুই বা তিন দিনেই এ সমস্যা ভালো হয়ে যায়। টিকা দেওয়ার পর বাহুর পেশিতে হাত দিয়ে ম্যাসাজ করতে থাকুন, বরফ ঘষে লাগান ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। চার থেকে ১০ দিনের মধ্যে ব্যথা হলে, গরম ও লালচে হয়ে ফুলে গেলে, দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। কারণ এটি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এমন হয় টিটি দেওয়ার পদ্ধতি সঠিক  জীবাণুমুক্ত না হওয়ার কারণে। কোনো নারী গর্ভবস্থার আগেই টিটি দিয়ে থাকলে মা ও শিশু উভয়েরই উপকার হয়। টিটি টিকা মা ও শিশুর মধ্যে রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে। তবে কোনো মায়ের গর্ভবস্থায় বা বিয়ের আগে টিটি টিকা দেওয়া থাকলেও তাঁর সন্তানকে ছয়টি রোগের টিকা দিতে হবে। টিটি দেওয়া থাকলে প্রসব-পরবর্তী কাটা-ছেঁড়া, গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) নিঃসরণের ক্ষতসহ নবজাতকের নাভি দ্রুত শুকাবে। গর্ভাবস্থার আগে টিটি টিকা দেওয়া না থাকলে গর্ভবস্থায় অবশ্যই তা গ্রহণ করুন। টিটি টিকা দেওয়ার সময়সীমা ডোজ টিকা দেওয়ার সময়সূচী রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার মেয়াদ টিটি-১ গর্ভবস্থায় অথবা ১৫-৪৯ বছর বয়সী মহিলা শূণ্য টিটি-২ টিটি-১ দেওয়ার চার সপ্তাহ পরে তিন বছর টিটি-৩ টিটি-২ দেওয়ার ছয় মাস পরে পাঁচ বছর টিটি-৪ টিটি-৩ দেওয়ার এক বছর পরে ১০ বছর টিটি-৫ টিটি-৪ দেওয়ার এক বছর পরে জীবনব্যাপী টিকা কোথায় পাওয়া যায় টিকা দেওয়া হয় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, মেডিকের কলেজ ও হাসপাতালে, বেসরকারি হলে সরকার অনুমোদিত থানা পর্যায়ে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিভিন্ন ওয়ার্ডভিত্তিক সূর্যের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোতে। এসব স্থানে প্রতি রোববার টিকা দেওয়া হয় সকাল নয়টা থেকে বেলা চারটা পর্যন্ত। অন্য দিনগুলোতে শুধু কোনো মা বা শিশুর টিকার শিডিউল থাকলে তা দেওয়া হয়। তবে রোববারই টিকা দেওয়ার নির্ধারিত দিন। টিকা দেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্ড করতে হয়। টিটি টিকার ডোজ পূরণ হতে সময় লাগে দুই বছর সাত মাস। দীর্ঘমেয়াদী ডোজের সময় ভুল এড়ানোর জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্ড করতে হয়। টিটি টিকার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় • কোনো নারী প্রথম ডোজ নেওয়ার তিন মাস পর টিকা নিলে (দ্বিতীয় ডোজ) তাঁকে সেই দিন থেকেই বাকি ডোজগুলোর জন্য শিডিউল দেওয়া হবে। টিকা দিতে যাওয়ার সময় রেজিস্ট্রেশন কার্ড নিয়ে যাবেন। ইনজেকশনের স্থানে (মাংসপেশি) ফোঁড়া হলে তাতে নখ দেবেন না। নখ দিলে ইনফেকশন হতে পারে। • খেয়াল রাখবেন, অব্যবহৃত এবং নতুন প্যাকেট থেকে যেন ইনজেকশনের সিরিঞ্জ, সূচ ব্যবহার করা হয়। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ সূচের মাধ্যমে একজনের সংক্রামক রোগ অন্যের দেহে প্রবাহিত হতে পারে। যেমন হেপাটাইটিস বি , সি, এইডস প্রভৃতি। সরকারী কর্মসূচীতে অটোডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়। • সূর্যের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিকের প্রায় ৬১টি জেলায় শাখা রয়েছে। এসব শাখার কর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। সূর্যের হাসিতে নামমাত্র মূল্যে উন্নত মানের সেবা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচীর লক্ষ্য সুস্থ মা-শিশুনির্বিশেষে সুস্থ জাতি গড়ে তোলা। • আজকের কিশোরী আগামী দিনের মা, একজন পুরুষের চালিকাশক্তি, একটি পরিবারের কর্ণধার, একটি শিশুকে সবলভাবে গড়ে তোলার হাতিয়ার। আর একটি শিশুই আগামী পথের আলো। শিশুকে হাত ধোয়ার অভ্যাস করাতে হবে শিশুর শরীরে জীবাণু প্রবেশ ঠেকানোর জন্য, জীবাণু একজন থেকে অন্যজনে ছড়ানো বন্ধ করার জন্য, শিশুকে হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো হলো সবচেয়ে ভালো উপায়। শিশুদেহে জীবাণু সংক্রমণের বহু পথ থাকছে। যেমন: * ময়লা হাতের মাধ্যমে * দূষিত ডায়াপার থেকে * জীবাণুদূষিত খাবার, পানীয় পান, পানিবাহিত হয়ে * হাঁচি-কাশির সাহায্যে বাতাসে ভর করে * অসুস্থ ব্যক্তির ব্যবহূত জিনিসপত্রের মাধ্যমে * অসুস্থ ব্যক্তির নিষ্কাশিত তরল, যেমন—রক্ত, কফ, মূত্র, মল ইত্যাদির সংস্পর্শে। হাত ধোয়ার মাধ্যমে যেসব রোগ ঠেকানো যায়: শিশু যখন এসব দূষিত বর্জ্যের স্পর্শ পায়, তারা অজান্তেই নিজ চোখ, নাক ও মুখে হাত লাগায়। এতে জীবাণু দেহে প্রবেশ করে। শিশুদেহে জীবাণু প্রবেশের পর পুরো পরিবার তাতে সংক্রমিত হয়ে যায়। সুতরাং ভালোভাবে হাত ধোয়া রোগবিস্তারের বিরুদ্ধে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর সাহায্যে যেসব রোগ হওয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়া যায়, সেগুলো হলো, সাধারণ সর্দি-কাশি এবং আরো মারাত্মক সব অসুখ যেমন - * মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত অসুখ) * ব্রংকিওলাইটিস (শ্বাসতন্ত্রের অসুখ) * হেপাটাইটিস-এ (যকৃতের প্রদাহ) * বিভিন্ন ধরনের ডায়রিয়া * ইনফ্লুয়েঞ্জা, সোয়াইন ফ্লু সঠিকভাবে হাত ধোয়ার পদ্ধতি: * হালকা গরম জলে হাত ধোয়া। * সাবানজলে ১০-১৫ সেকেন্ডের জন্য হাত ধুতে হবে, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান লাগবে এমন কথা নেই। যেকোনো সাবান হলেই চলবে। সতর্ক থাকতে হবে, যেন আঙুলের ফাঁকে ও নখের ভেতর যেখানে জীবাণু লুকিয়ে থাকে, তা পরিষ্কার করা হয়। অবশ্যই হাতের কবজির কথা ভুলে গেলে চলবে না। * পরিষ্কার জলে এবার ধুয়ে নিন, শুকনো তোয়ালে দিয়ে মুছে নিন। কিছু টিপস: শিশু যদি হাত ধুতে না চায় তবে তাকে আকৃষ্ট করার জন্য কিছু ব্যবস্থা নিতে পারেন। * কিছু রঙিন সাবান, যা বাচ্চার জন্য তৈরি তা দিতে পারেন * নানা আকৃতির সাবান, যা শিশুকে টানে * ঘ্রাণ, যা শিশুর মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে * এ সময় তার প্রিয় একটা গান চালিয়ে দিন। গান শেষ হতে হতে হাত ধোয়া ও জীবাণুর বিদায় পর্ব শেষ হয়ে আসবে। জীবাণু থেকে পারিবারিক সুরক্ষা: পরিবারের সবাইকে জীবাণু সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করিয়ে নিন। * খাওয়ার আগে ও খাবার বানানোর আগে * বাথরুম ব্যবহারের পর * ঘরের চারপাশ পরিষ্কার করে আসার পর * কোনো জীবজন্তুর সংস্পর্শে এলে * কোনো অসুস্থ বন্ধু বা আত্মীয়কে দেখতে যাওয়ার আগে এবং দেখে আসার পরে * সর্দি, হাঁচি, কাশিতে আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে এসে নাক ঝাড়ার আগে * বাইরে থেকে (খেলাধুলা, বাগান পরিচর্যা, হেঁটে আসা) গৃহে আসার পরপর। শিশু থাকুক পানিবাহিত রোগমুক্ত পানিবাহিত নানা রকম ছোঁয়াচে রোগের কবলে পড়ে প্রতিদিন ঘটে অনেক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। খাওয়ার পানি যখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দোষে দূষিত হয়, তখন নানা রকম রাসায়নিক বিষাক্ত পদার্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এতে মারাত্মক কিছু রোগের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ক. আর্সেনিকদূষণ: আর্সেনিক অত্যন্ত বিষাক্ত দ্রব্য এবং স্বল্পমাত্রাতেই এটি মানবদেহের ক্ষতিসাধন করে। এর অন্য নাম ব্ল্যাকফুট ডিজিজ। ত্বক, ফুসফুস, কিডনি ছাড়াও এতে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। খ. ফ্লুরাইডস: শিশুর দাঁত, অস্থিকাঠামো গঠনে এটি এক প্রয়োজনীয় উপাদান। পানিতে এর অতিরিক্ত মাত্রা ফ্লুরোসিস নামের রোগ তৈরি করে। বাচ্চা ওজন হারাতে থাকে, ফ্যাকাসে হয়ে যায়। দাঁতের এনামেলে স্পট দেখা যায়। চুল যায় পড়ে ও ত্বকে প্রদাহ দেখা দেয়। গ. সিসা দ্বারা সৃষ্ট রোগ: পানির পাইপ ও ফিটিংস থেকে মূলত খাওয়ার পানিতে সিসার মিশ্রণ ঘটতে পারে। সিসা মারাত্মক বিষজাতীয় পদার্থ। দেহে রক্ত তৈরি ও স্নায়ুতন্ত্র কার্যকর রাখতে যেসব এনজাইমের দরকার, সিসা সেসব এনজাইম সিস্টেমে আঘাত হানে। ঘ. পেস্টিসাইডস: ডিডিটি জাতীয় বিষাক্ত দ্রব্য কৃষিকাজে ব্যবহারের কারণে তা পানিতে দূষণ ঘটায়। নাইট্রেট, ব্রোমাইট, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি বিষাক্ত পদার্থও পানিদূষণের কুফল হিসেবে শিশুর দেহে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। পানিবাহিত সংক্রামক রোগ অধিকাংশ পানিবাহিত রোগ সংক্রামক। যেমন—কলেরা, টাইফয়েড, সিজেলোসিস (ডিসেনট্রি), হেপাটাইটিস-এ, ইত্যাদি। কলেরা ও টাইফয়েডের ক্ষেত্রে অতি অল্পসংখ্যক জীবাণু মারাত্মক ডায়রিয়া তৈরি করতে সক্ষম। বাসনপত্র পরিষ্কার করা ও গোসলের জন্য প্রয়োজনমাফিক পানি না পাওয়া গেলে বেশ কিছু রোগ সংক্রমিত হয়। চোখ, ত্বকের অসুখ, ডায়রিয়া, ট্র্যাকোমা, স্ক্যাবিস প্রভৃতি রোগ পানিসংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুর শরীরে যেসব পানিবাহিত রোগজীবাণু প্রবেশ করে, তা নতুন নতুন জীবাণু যেমন সংক্রমণ ঘটায়, তেমনি পুরোনো জীবাণুগুলো নতুনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং শিশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। প্রতিরোধ জীবাণুমুক্ত পানি পান, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসম্মত বিষয়গুলো শিশুদের ছোট বয়স থেকে শিক্ষা দিলে এসব রোগগুলোকে অনেকাংশেই দূরে রাখা যায়। স্কুলকে কেন্দ্র ধরে যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে তা হবে শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমাদের দেশের প্রতিটি স্কুল কমিটি এ বিষয়ে মনোযোগ দিলে একটা সার্বিক পরিবর্তন আসতে পারে। জানার মধ্যে অনেক ভুল টুকটাক ডাক্তারি আমরা সবাই করি। সর্দি-কাশি থেকে জ্বরে বহু ওষুধ নিজেরাই কিনে খাই। দু-একজনকে পরামর্শও দিই। এর বাইরেও মনের মধ্যে আছে বেশ কিছু ধারণা। কিছু নিজে নিজে বিশ্বাস করেছি, কিছু বিশ্বাস এসেছে অন্যজনের কাছ থেকে। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এমন কিছু বিশ্বাসের কোনো সত্যতা নেই। কিন্তু বহুযুগ লালিত এই বিশ্বাসগুলো এতটাই শক্তিশালী যে ডাক্তাররা পর্যন্ত রোগীর বিভ্রান্তি কাটাতে সক্ষম হন না সব সময়। সেরকম কিছু বিষয় নিয়েই আলোচনা রইলো। ১. বেশি খেলে গর্ভের বাচ্চা বড় হয় না বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে এ ধারণাটি ব্যাপক। গ্রামে প্রায় সবার মধ্যেই আছে এ ধারণাটি। তাদের যুক্তি, গর্ভকালীন বেশি খেলে পেটের জায়গা দখল হয়ে যায় খাবার দিয়ে। ফলে গর্ভের বাচ্চাটি বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পায় না। এটি খুবই ভুল ধারণা। গর্ভকালীন মায়ের জন্য আসলে দুজন মানুষের খাবার দরকার। বাচ্চার জন্য আলাদা স্থান রয়েছে। সে স্থানের সঙ্গে পাকস্থলীর কোনো সম্পর্ক নেই। বাচ্চা বড় হবে, জরায়ুতে তার জন্য জায়গা বাড়তে থাকবে। গর্ভকালীন মা কম খেলে বাচ্চা বরং ওজনে কম হতে পারে। ২. মুখে মধু, বাক্যে অমৃত শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে নাকি মুখে মধু দিলে সেই বাচ্চা হয় মিষ্টভাষী। তাই জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে কয়েক ফোঁটা মধু দেয় নিকটাত্দীয়রা। কেউ কেউ দেয় পানি, এমনকি কৌটার দুধও। কিন্তু ডাক্তারি বিদ্যায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে, বাচ্চার জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ ছাড়া তার প্রয়োজন নেই এক ফোঁটা পানিও। অন্য কিছু তো তার মুখে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটা আন্তর্জাতিক আইনেও আছে। মধু, পানি এবং কৌটার দুধ থেকে শুরু করে যেকোনো খাবার শিশুর শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এসব খাবারে শিশু বমি, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যায় আক্রান্ত হয়। ৩. মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয় বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হবে-এ ধারণাটি মোটামুটি সব মানুষের মধ্যেই আছে। প্রকৃতপক্ষে ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য মিষ্টি দায়ী নয় একটুও। ডায়াবেটিস হওয়ার পর মিষ্টি খেলে রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু ডায়াবেটিস হওয়ার আগে যতই মিষ্টি খাওয়া হোক, সুগারের পরিমাণ কিন্তু ঠিকই থাকবে। যদি প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়ে ঠিকমতো ইনসুলিন তৈরি এবং নিঃসরণ হয়, তাহলে মিষ্টিতে কোনো ক্ষতি হবে না। আসলে ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য দায়ী হচ্ছে অতিরিক্ত ওজন, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং পারিবারিক ইতিহাস। ৪. দিনে আট গ্লাস পানি খেলে রোগমুক্ত থাকা যায় ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বোর্ড দেশটির জনগণকে দৈনিক আট গ্লাস ফ্লুইড বা তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিল। সেখান থেকে একান-ওকান হয়ে পৃথিবীজুড়ে প্রচলিত হয়ে গেছে এই মতবাদ। পানি যে আমাদের জন্য খুব দরকারী একটি জিনিস তাতে সন্দেহ নেই। তবে চা, দুধ, ফল এমনকি শাক-সবজিও শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করতে পারে। তৃষ্ণা পেলে অবশ্যই পানি খাবেন। কিন্তু অতিরিক্ত পানিও বিপদের কারণ হতে পারে। এতে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন আপনি। ৫. দুশ্চিন্তায় চুল পাকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা মানুষের ভেতরের আর বাইরের বয়স দুটোই বাড়িয়ে দেয়। তবে এর কারণে যে চুল পেকে যায় এই ধারণাকে সমর্থন করে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি আজো। বরং মানুষের চুল পাকে জিনগত কারণে। তাই চিন্তা করলেন আর নাই করলেন তার সঙ্গে চুল পাকার সম্পর্ক নেই। ৬. কোলেস্টেরল বাড়লে ডিম খাওয়া যাবে না যাদের উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল আছে তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই ধারণা একটি ডিমও খাওয়া উচিত নয়। ডিমে প্রোটিন থাকে কিন্তু তার পরিমাণ কম এবং এটি ভিটামিন এ আর ভিটামিন ডির জোগান দেয়। সুতরাং এর উপকারিতাও কম নয়। তবে এটা ঠিক একটা ডিমে ২১৩ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দৈনিক কোলেস্টেরেল গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা ৩০০ মিলিগ্রাম। সুতরাং নাশতায় একটি ডিম আপনি খেতেই পারেন, কেবল অন্য যেসব খাবার খাচ্ছেন সেগুলো কতটা কোলেস্টেরলযুক্ত সেটা খেয়াল রাখলেই হলো। তবে দিনে একটার বেশি ডিম খাওয়া যাবে না। ৭. ইনসুলিন ক্ষতিকর ডায়াবেটিক রোগীকে ইনসুলিন নিতে হবে বললেই চোখ-মুখ শুকিয়ে যায়। তারা মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট খেতে নিরাপদ বোধ করে। এর কারণ কিন্তু কেবল ইনজেকশন নেয়ার ভয় নয়। বহু ডায়াবেটিস রোগীই মনে করে, ইনসুলিন নেয়া ক্ষতিকর। ইনসুলিন মানেই ডায়াবেটিসের শেষ চিকিৎসা। আসলে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ইনসুলিন নিরাপদ একটি ওষুধ। ৮. গরুর মাংস ভালো নয় গরুর মাংস খেতে সুস্বাদু। কিন্তু যে খায়, সেও জানে, এটা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। বর্ধনশীল বয়সে গরুর মাংস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি খাবার। এটা উচ্চমাত্রার প্রোটিনের উৎস। কোনো অ্যাক্সিডেন্ট, দুর্বলতা, অপুষ্টি, অপারেশনের পর দ্রুত সেরে উঠতে এটা সাহায্য করে। চর্বি ছাড়িয়ে পরিমিত গরুর মাংস খেলে লাভই বেশি। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি এবং যাদের গরুর মাংসে অ্যালার্জি আছে, তাদের এই খাদ্যটি এড়িয়ে চলা ভালো। ৯. টক খেলে ক্ষত শুকায় না কোথাও কেটে গেলে বা অস্ত্রোপচারের পর টক-জাতীয় খাবার খেলে ক্ষত শুকাতে সময় লাগে। অনেক শিক্ষিত লোকের মধ্যেও এ ধারণাটি আছে। কিন্তু লেবু, কমলা, আমড়া, বরই, কামরাঙা ইত্যাদি টক-জাতীয় ফল হলো ভিটামিন 'সি'র একটি ভালো উৎস। এই ভিটামিন 'সি' কোলাজেন তৈরির মাধ্যমে ক্ষতস্থান দ্রুত শুকিয়ে যেতে সাহায্য করে। তাই কাটাছেঁড়ার ক্ষত শুকাতে টক-জাতীয় খাবার ক্ষতি নয়, উপকার করে। ১০. ক্রিম রং ফর্সা করে বিজ্ঞাপনের শক্তিশালী ভাষার কাছে বিজ্ঞান নিতান্তই অসহায়। ত্বকের মেলানিন নিয়ন্ত্রণ করে বা কমিয়ে ক্রিম করছে নারীকে অপরূপ। ইদানীং পুরুষদের রং ফর্সা করারও ক্রিম এসেছে। ত্বকের কেরাটিনযুক্ত স্কোয়ামাস এপিথেলিয়াম ভেদ করে ক্রিমের কোনো উপাদানই ভেতরে যেতে পারে না এবং এগুলো ত্বকে অ্যাবজর্ব বা শোষিতও হয় না। বরং খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে ত্বকের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করুন, তাতে ফ্রেশ ও সুন্দর থাকতে পারবেন। তবে শীতকালে ক্রিমের ব্যবহার উপকারী। এ সময় ক্রিমের ব্যবহারে ত্বকের পানি বা ময়েশ্চার বের হয়ে যাওয়া ঠেকানো যায়। ১১. তেল চুল লম্বা করে, মাথা ঠাণ্ডা রাখে অনেকে ভাবে, তেল মাথা ঠাণ্ডা রাখে এবং চুল শক্ত, ঘন ও লম্বা করে। কেউ কেউ আবার চুলে লাগায় ভিটামিন। এতে নাকি চুল পড়াও বন্ধ হয়। এর সবই ভুল। তেল মাথার মোটা চামড়া ও খুলি ভেদ করে ব্রেইন পর্যন্ত যাওয়ার কোনো সুযোগই পায় না, ঠাণ্ডা করা তো দূরের কথা। তবে অনেক তেলে মেন্থল মেশানো থাকে বলে একটা ঠাণ্ডা অনুভূতি তৈরি করতে পারে কেবল মাথার চামড়ায়। চুল শরীরের অংশ, কিন্তু এটা নির্জীব। মৃতকোষ এরা। এদের সারাদিন ভিটামিনে ডুবিয়ে রাখলেও কোনো লাভ নেই। ঘন, লম্বা ও শক্ত করার তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং মাথার চুল পরিষ্কার রাখলে চুল সুস্থ থাকবে। এতেই চুল পড়া কমবে। তবে তেল চুলে ময়েশ্চার বজায় রাখে এবং জটা বাঁধা রোধ করে বলে চুল ছিঁড়ে যাওয়ার সমস্যা কমিয়ে দেয়। ১২. শীতের রোদ উপকারী অনেকেই ভাবে, শীতকালের রোদ খুব উপকারী। এ সময় রোদ হয় নরম। এটা ঠিক যে, শীতকালে রোদে গেলে আরাম লাগে। এর কারণ, রোদের গরম আঁচ। শীতের রোদেও ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থাকে; এবং এতে ঘোরাঘুরি করা মোটেই ভালো নয়। এ রকম ধারণাকারীর সংখ্যা আমাদের দেশে অনেক। আসুন, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে কোনো কথা বিশ্বাস করা এবং মেনে চলার আগে সেটা সঠিক কি না তা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিই। কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য চোখের যত্ন কম্পিউটার মনিটরে নিয়মিত ও অনেকক্ষণ ধরে কাজ করলে চোখের নানা সমস্যা ও উপসর্গ দেখা দিতে পারে-এ অবস্থাকে বলা হয় কম্পিউটার ভিশন সিনড্রম। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে যাঁরা প্রতিদিন কম্পিউটারে কাজ করে থাকেন, তাঁদের ৮৮ শতাংশ লোকেরই সামান্য থেকে বেশি-নানা মাত্রার চোখের উপসর্গ রয়েছে। সুতরাং কম্পিউটার ভিশন সিনড্রম একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যাই হয়ে গেছে। উপসর্গ মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া করা, চোখের ক্লান্তি বোধ করা, ঝাপসা দেখা বা মাঝেমধ্যে দুটি দেখা, ঘাড়ে ও কাঁধে ব্যথা কারণ কম্পিউটার অক্ষরগুলো ছাপার অক্ষরের মতো নয়। ছাপার অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ এবং পার্শ্বের ঘনত্ব একই রকম—এগুলো দেখার জন্য সহজেই চোখের ফোকাস করা যায়, অন্যদিকে মনিটরের অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ ভালো দেখা যায় কিন্তু পার্শ্বভাগের ঘনত্ব কম হওয়ায় পরিষ্কার ফোকাসে আসে না। মনিটরের অক্ষরগুলোর এই ফোকাসের অসমতার জন্য চোখের নিকটে দেখার যে প্রক্রিয়া বা অ্যাকোডোমেশন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এভাবে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের নানা উপসর্গ দেখা দেয়। কম্পিউটারের চশমা সাধারণ লেখাপড়ার সময় ১৪ থেকে ১৬ ইঞ্চি দূরে পড়ার জন্য যে পাওয়ারের চশমা লাগে, কম্পিউটারে কাজ করার সময় ১৮ থেকে ২৮ ইঞ্চি দূরে মনিটর রেখে সে পাওয়ার দিয়ে ভালো দেখা যায় না। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা কম্পিউটারে কাজ করার জন্য বিশেষ পাওয়ারের চশমা দিয়ে থাকেন, যার নাম কম্পিউটার চশমা। ৩৫ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের ইউনিফোকাল বা শুধু একটি পাওয়ারের চশমা দিলেই চলে কিন্তু পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য কোনো কোনো সময় ওই ইউনিফোকাল চশমা দিয়ে তুলনামূলক কাছে কপি পড়তে অসুবিধা হতে পারে—তাঁদের জন্য মাল্টি ফোকাল চশমা দিলে কপি পড়া এবং মনিটরে কাজ করার সুবিধা হয়। মুক্তি পাওয়ার নয়টি উপায় ক. চোখ পরীক্ষা: কম্পিউটারে কাজ করার আগে চক্ষু পরীক্ষা করে, চোখের কোনো পাওয়ার থাকলে অবশ্যই চশমা ব্যবহার করতে হবে। চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কম্পিউটার আই গ্লাস ব্যবহার করতে হবে। খ. সঠিক আলোর ব্যবহার: ঘরের ভেতর বা বাইরে থেকে আসা অতিরিক্ত আলো চোখের ব্যথার কারণ হতে পারে। বাইরে থেকে আলো এসে চোখে না লাগে বা কম্পিউটার পর্দায় না পড়ে সে জন্য পর্দা, ব্লাইন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের আলো—টিউবলাইট বা ফ্লোরেসেন্ট বাল্বের আলো হলে এবং স্বাভাবিক অফিসের আলোর চেয়ে কিছুটা কম হলে চোখের জন্য আরামদায়ক। গ. গ্লেয়ার কমানো: কম্পিউটার মনিটরের আন্টি গ্লেয়ার স্ক্রিন ব্যবহার করে এবং চশমায় অ্যান্টি রিফ্লেকটিভ প্লাস্টিকের কাচ ব্যবহার করলে গ্লেয়ার কমানো যায়। ঘ. মনিটরের ‘ব্রাইটনেস’ সমন্বয়: ঘরের আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে কম্পিউটার মনিটরের আলো কমানো বা বাড়ানো, যাতে মনিটরে লেখাগুলো দেখতে আরামদায়ক হয়। ঙ. ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন: কম্পিউটারে কাজ করার সময় চোখের পলক পড়া কমে যায়। এর ফলে চোখের পানি কমে যায় ও চক্ষু শুষ্কতা বা ড্রাই আই হতে পারে। এ অবস্থায় চোখ শুষ্ক মনে হবে। কাটা কাটা লাগবে। চোখের অস্বস্তি ও ক্লান্তি আসবে। কম্পিউটারে কাজের সময় ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন। এর পরও সমস্যা থাকলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে চোখের কৃত্রিম পানি ব্যবহার করুন। চ. চোখের ব্যায়াম: ৩০ মিনিট কম্পিউটারে কাজ করার পর অন্য দিকে দূরে তাকান। সম্ভব হলে ঘরের বাইরে কোথাও দেখুন এবং আবার নিকটে অন্য কিছু দেখুন। এতে চোখের বিভিন্ন ফোকাসিং মাংসপেশির ব্যায়াম হবে। এভাবে কয়েকবার করে আবার কিছুক্ষণ কাজ করুন। ছ. মাঝেমধ্যে কাজের বিরতি দিন: কাজের মাঝেমধ্যে কয়েক মিনিটের জন্য বিরতি দিন। এক ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করে ৫-১০ মিনিটের বিরতি দিয়ে অন্য কোনো দিকে দেখুন বা অন্য কোনো কাজে সময় কাটিয়ে আবার কম্পিউটারের কাজ শুরু করতে পারেন। অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই ঘণ্টা একটানা কম্পিউটারে কাজ করে ১০-২০ মিনিটের বিরতি দিলেও একই রকম ফল পাওয়া যায়। জ. কাজের জায়গার কিছু পরিবর্তন: কম্পিউটারে কাজ করার চেয়ারটি হাইড্রোলিক হলে ভালো হয়, যাতে কাজের সময় চোখের উচ্চতা কম্পিউটার মনিটরের চেয়ে সামান্য উঁচুতে থাকে। মনিটর চোখের বরাবর থাকতে হবে। মনিটর বাঁকা থাকলে অক্ষরগুলোর পরিবর্তন হতে পারে, যা চোখের ব্যথার কারণ হতে পারে। অনেক সময় টাইপ করার কপিটি এখানে সেখানে রেখে বারবার মনিটর থেকে অনেকখানি দূরে কপি দেখতে হয়। এতেও মাথাব্যথা ও চোখে ব্যথা হতে পারে। মনিটরের পাশেই পরিমিত আলো ফেলে কপি স্ট্যান্ডে লেখাগুলো রাখা যেতে পারে। তাতে বারবার চোখের অ্যাকোমোডেশনের পরিবর্তন কম হবে ও কাজ আরামদায়ক হবে। ঝ. কাজের ফাঁকে ফাঁকে ব্যায়াম করা: কম্পিউটারে কাজের সময় শুধু চোখের বা মাথার ব্যথা হয় না, অনেকেরই ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, কোমরে ব্যথা- এসব উপসর্গ হতে পারে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত, পা ও কাঁধের নাড়াচাড়া করা হয় বা ব্যায়াম করা হয়, তাহলে ওপরের উপসর্গসমূহ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। হিস্টিরিয়া একটি মানসিক রোগ আমাদের অবচেতন মনের অবদমিত মানসিক দ্বন্দ্ব থেকেই হিস্টিরিয়া রোগের সৃষ্টি। হিস্টিরিয়াকে বলা হয় ‘কনভারসন ডিজঅর্ডার’ বা ‘কনভারসন ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার’ । ‘কনভারসন ডিসঅর্ডারে’ শারীরিক লক্ষণ-হাত-পা অবশ, কথা বলতে না পারা-প্রভৃতি নিয়ে রোগের প্রকাশভঙ্গি দেখা যায়। যদিও প্রকৃতপক্ষে শারীরিক কোনো সমস্যা থাকে না। আর ‘ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডারে’ বিভিন্ন মানসিক লক্ষণ দেখা যায়-যেমন, ভুলে যাওয়া, নিজের পরিচয় মনে করতে না পারা, নিরুদ্দেশে চলে যাওয়া, পূর্বের স্মৃতি ভুলে যাওয়া প্রভৃতি। আমাদের অবচেতন মনের কিছু অবদমিত সহজাত কামনার সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচারের সংঘাত ঘটে। সৃষ্টি হয় সহ্যাতীত উত্কণ্ঠা ও মানসিক চাপ। ফলে আমাদের অজ্ঞাতেই কিছু মানসিক ক্রিয়া সেই সহজাত কামনাগুলোকে দমন করে। যখন কোনো কারণে মানসিক ক্রিয়াশক্তি দুর্বল হয়ে যায়, তখন সেই অবাঞ্ছিত অবদমিত কামনাগুলো সজ্ঞান চেতনায় উঠে আসতে চায়। শুরু হয় দ্বন্দ্ব, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানা শারীরিক লক্ষণে। কারও কারও মতে, সামাজিক বিধিনিষেধ যখন আমাদের কামনা-বাসনাগুলোকে অবদমিত করে রাখে, তখন সেই অবদমিত কামনা-বাসনাগুলো অন্যভাবে (শারীরিক লক্ষণ হিসেবে) প্রকাশ পায়; তখন হয় হিস্টিরিয়া। মস্তিষ্কের বাঁ ও ডান-দুটি অংশ থাকে। যখন কোনো কারণে দুই অংশের কাজে সমন্বয়হীনতা ঘটে, তখন হিস্টিরিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। মস্তিষ্কের ‘ব্যাসাল গ্যাংলিয়া’ ও ‘থ্যালামাস’-এ দুটি অংশকে হিস্টিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে ধারণা করা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে যদি কাউকে নিপীড়ন করা হয়, কেউ যদি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, কাউকে যদি কোনো কারণে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং এসব ক্ষেত্রে তারা যদি বিষয়টি প্রকাশ করতে না পারে, উপযুক্ত প্রতিকার না পায়, তবে অবদমিত ক্ষোভ ও ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তি থেকে হিস্টিরিয়া দেখা যেতে পারে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি। বয়ঃসন্ধিকালে এ সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। হিস্টিরিয়ার সঙ্গে বিষণ্নতা, উত্কণ্ঠা, ব্যক্তিত্বের বিকার প্রভৃতি মানসিক রোগ থাকতে পারে। হিস্টিরিয়ায় কখনো শরীরের কোনো অংশ—যেমন হাত-পা বা পুরো শরীরই অবশ হয়ে যাচ্ছে বলে রোগী অভিযোগ করে। কথা বলতে না পারা, ঢোক গিলতে না পারা, গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে বলে মনে হওয়া বা প্রস্রাব আটকে যাওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যেতে পারে। আবার কখনো দেখা যায়, রোগী কথা বলতে হঠাত্ করেই কথা বলতে পারছে না, ইশারা-ইঙ্গিতে সব বোঝাচ্ছে। কখনো চোখে না দেখা বা কানে শুনতে না পারার মতো লক্ষণও তাদের থাকে। খিঁচুনির মতো লক্ষণও থাকতে পারে হিস্টিরিয়া রোগীর। বারবার খিঁচুনি হয়ে তারা ‘অজ্ঞান’ হয়ে যায়। যদিও সেটা প্রকৃত খিঁচুনি বা অজ্ঞান নয়। মৃগী রোগের প্রকৃত খিঁচুনির মতো এখানে জিব বা ঠোঁট কেটে যায় না, কাপড়চোপড়ে প্রস্রাব হয়ে যায় না, একা থাকলে বা ঘুমের মধ্যে হিস্টিরিয়া রোগীর খিঁচুনি হয় না। হাত-পায়ের অস্বাভাবিক নড়াচড়া, বারবার চোখের পলক পড়া, জোর করে চোখ বন্ধ করে রাখা, ঘাড় বাঁকা করে থাকা এবং বমি করা বা বারবার বমির চেষ্টা করা প্রভৃতি লক্ষণও থাকতে পারে। রোগের লক্ষণগুলো নিয়ে তাদের স্বজনদের মধ্যে যতই উত্কণ্ঠা থাকুক, রোগী নিজে কিন্তু অনেকটা বিকারহীন থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, রোগী ঢেউয়ের মতো হাত নাড়াতে নাড়াতে দেহকে অনিয়মিতভাবে কাঁপিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে হাঁটে। মনে হয়, এই বুঝি পড়ে যাবে। তবে সাধারণত তারা পড়ে যায় না। যদি পড়েও যায়, তবে এমনভাবে পড়ে, যাতে দেহে কোনো আঘাত না লাগে। শারীরিক লক্ষণগুলো প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে হিস্টিরিয়া রোগী তার অবদমিত ইচ্ছাগুলোর যে ইঙ্গিতময় প্রকাশ ঘটায়, সেটাকে বলা হয় প্রাথমিক অর্জন। আর শারীরিক লক্ষণগুলো প্রকাশ করে সে তার পরিবার ও সমাজ থেকে যে করুণা, সহানুভূতি অর্জন করে এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পায়, তা তার পরবর্তী অর্জন। ভান বা ভণ্ডামি নয়, মানসিক রোগ একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে হিস্টিরিয়া কোনো রোগ নয়। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি অনেক চিকিত্সকও বলে থাকেন, হিস্টিরিয়া এক ধরনের ভান। আসলে হিস্টিরিয়া কোনো ভান নয়, ভণ্ডামি নয়-মনের রোগ। এ রোগের উপযুক্ত চিকিত্সা আছে। আরও ধারণা করা হয় যে রোগী ইচ্ছা করে তার লক্ষণগুলো দেখাচ্ছে কিন্তু বাস্তব ঘটনা হচ্ছে, সে মোটেই ইচ্ছা করে এসব করছে না, বরং তার অবচেতন মন তাকে দিয়ে এ লক্ষণগুলো ফুটিয়ে তুলছে তার প্রকৃত ইচ্ছাশক্তির বিরুদ্ধে। তাই তাকে এ রোগের জন্য বকা দেওয়া, সমালোচনা বা তিরস্কার করা চলবে না। হিস্টিরিয়া একটি রোগ। একে তাচ্ছিল্য করা যাবে না। এ রোগের নিরাময়ের জন্য চিকিত্সকের পাশাপাশি রোগীর স্বজনদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। চিকিত্সা করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে এ রোগের চিকিত্সায় রোগীকে ‘প্রাইমারি গেইন’ ও ‘হিস্টিরিক গেইন’ অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। তাই তার রোগের লক্ষণকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নিলেও অহেতুক বাড়াবাড়ি করা যাবে না-যেমন হিস্টিরিয়ায় পক্ষাঘাতগ্রস্ততার মতো লক্ষণ দেখা গেলেও সঙ্গে সঙ্গে তাকে হুইল-চেয়ারের ব্যবস্থা না করে হাঁটতে উত্সাহিত করতে হবে। তার চারপাশে ভিড় করে স্বজনদের বিলাপ করা, হাত-পায়ে তেল মালিশ করা, মাথায় বালতি-বালতি পানি ঢালা-এসব করা চলবে না। রোগী ও তার স্বজনদের কাছ থেকে তার রোগের ধারাবাহিক ও বিস্তারিত বর্ণনা নেবেন চিকিত্সক। রোগের লক্ষণগুলো কোনো প্রকৃত শারীরিক কারণে হচ্ছে কি না, তা জানার জন্য অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে। রোগীকে ইতিবাচক ভঙ্গিতে আশ্বস্ত করতে হবে যে তার এ রোগটি সাময়িক, নিরাময়যোগ্য-হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রোগ দ্রুত নিরাময়ের জন্য তার সঙ্গে যথাসম্ভব বেশি আলোচনা করতে হবে। তার মনের অন্তর্জগত্ থেকে তার না-বলা কথাগুলো খুঁজে বের করে আনতে হবে এবং অবশ্যই কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। হিস্টিরিয়ার সঙ্গে উত্কণ্ঠা বা বিষণ্নতা থাকলে কেবল চিকিত্সকের পরামর্শে উত্কণ্ঠাবিনাশী ও বিষণ্নতারোধী ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। কাউন্সেলিং, পারিবারিক সাইকোথেরাপি ও গ্রুপ সাইকোথেরাপির মাধ্যমে হিস্টিরিয়ার চিকিত্সা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর অবচেতন মনের দ্বন্দ্ব দূর করা হয়। হিস্টিরিয়া রোগকে তাচ্ছিল্য ও রোগীকে অবহেলা করে নয়, বরং রোগটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। যেকোনো শারীরিক রোগের মতোই এটি এক ধরনের মানসিক রোগ। আমাদের চারপাশে অনেকেই এ রোগে ভুগছে আর অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছে। কেবল উপযুক্ত চিকিত্সা ও পরিমিত সহানুভূতিই পারে এ রোগ থেকে রোগীকে সারিয়ে তুলতে। এ জন্য প্রয়োজন সবার সচেতনতা ও সহযোগিতা। জন্মের সময় শিশুর কান্না জরুরী ব্যথায় আমরা কাঁদি। কখনো বা আনন্দেও আমাদের কান্না পায়। কিন্তু বাঁচার জন্য কান্না অপরিহার্য কখন? জীবনের প্রথম কান্না শুধুই বাঁচার জন্য। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুর প্রথম কান্না বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। সদ্যোজাত শিশু পৃথিবীতে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ওঠে। এ এক চিরাচরিত দৃশ্য। মায়ের গর্ভে শিশু থাকে একরকম তরল পদার্থের ভেতর। তার ফুসফুস থাকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায়। বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ও অপরিহার্য যে অক্সিজেন, তা এ সময় সে পায় গর্ভফুলের মাধ্যমে; মায়ের কাছ থেকে। নাভি-নাড়ি কাটার সঙ্গে সঙ্গে ঘটে তার চিরবিচ্ছেদ। শিশুর প্রথম কান্না বা চিত্কারের সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ঢোকে তার ফুসফুসে। এ সময় ফুসফুস সক্রিয় হয়ে ওঠে, শুরু হয় স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। বাতাসের সঙ্গে অক্সিজেন ফুসফুসে ঢুকে রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। শিশু যদি জন্মের সঙ্গে সঙ্গে না কাঁদে, তাহলে তার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যায়, যা তার মস্তিষ্কসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও (কিডনি, হৃৎপিণ্ড, খাদ্যনালি ইত্যাদি) ক্ষতি সাধন করে। এমনকি শিশুর জীবনকে তা বিপন্ন করে তুলতে পারে। সাধারণত: জন্মের দু-এক মিনিটের মধ্যে তরলে ভেজা সদ্যোজাত শিশুর শরীর শুকনো ও উষ্ণ কাপড় দিয়ে মোছানোর সময় অধিকাংশ শিশু কেঁদে ওঠে। কিন্তু যদি এ সময় শিশু না কাঁদে তাহলে করণীয়: * হাতের তালু দিয়ে পিঠের মেরুদণ্ড বরাবর ওপর থেকে নীচে ঘষে দিতে হবে (দু-তিনবার)। * পায়ের পাতায় টোকা দিতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ শিশু স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে শুরু করে। এ সময় শিশুর শরীর গরম রাখার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে শুকনো ও উষ্ণ কাপড় দিয়ে শিশুকে পুনরায় জড়িয়ে রাখতে হবে। এর পরও যদি না কাঁদে তাহলে: * শিশুর মুখের ভেতর শ্লেষ্মা থাকলে মুখ, নাক পরিষ্কার করে দিতে হবে নরম পরিষ্কার কাপড়, গজ বা বাল্ব সাকার দিয়ে। তখনো শ্বাস-প্রশ্বাস চালু না হলে প্রশিক্ষিত সেবিকা বা চিকিত্সকের সাহায্য নিতে হবে। যা করা যাবে না জন্মের সঙ্গে সঙ্গে না কাঁদলে অনেক সময় তার পা ধরে মাথা নীচে ঝুলিয়ে পিঠে চাপড় দেওয়া হয়। এটি সদ্যোজাত শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে; যেমন এতে শিশুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। সুতরাং এ কাজ করা যাবে না। অ্যালার্জি অ্যালার্জির কারণসমূহ • ধুলাবালি, ফুলের রেণু, ‘মাইট’ যা কিনা তোষক, কার্পেট, পুরাতন কাপড়, পর্দার ভাঁজে থাকে এবং কিছু খাদ্য। • ঘরের ধুলো-ময়লা, পশুপাখির লোম ও পাখনা, পোকামাকড়ের হুল ও কামড়, কেমিক্যালস, কিছু ওষুধ, প্রসাধনসামগ্রী, উগ্র সুগন্ধি বা তীব্র দুর্গন্ধ ইত্যাদি। • এছাড়াও গাড়ির নির্গত ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বিভিন্ন উপাদানও অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। এসব পদার্থ যখন শরীরের সংস্পর্শে আসে, তখন শরীরে এক অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যেমন- সর্দি, চুলকানি, ত্বক ফুলে যাওয়া, হাঁচি-কাশি ইত্যাদি। এ অস্বাভাবিক উপসর্গগুলোই হল অ্যালার্জি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা অ্যালার্জির সঠিক চিকিৎসার জন্য কিছু ল্যাব পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন- রক্ত, প্রস্রাব ও মলের রুটিন পরীক্ষা, রক্তের সুগার, আইজিই এন্টিবডি ইত্যাদি। প্রয়োজনে বুকের, নাকের ও সাইনাসের এক্সরে করে দেখা যেতে পারে। অ্যালার্জি প্রতিরোধ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা অ্যালার্জি প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হল কারণগুলো শনাক্ত করে তা এড়িয়ে চলা। এজন্য রোগীকে খুব সতর্কতার সঙ্গে খুঁজে বের করতে হবে, তার শরীরে কী কী কারণে অ্যালার্জি হয়। রোগের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানতে হবে এবং অ্যালার্জির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে প্রচলিত আধুনিক চিকিৎসার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। অ্যালার্জির জটিলতা অ্যালার্জির সুচিকিৎসা না হলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। • নাকের অ্যালার্জি সর্দি থেকে শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ রোগীর হাঁপানি হতে পারে। • এছাড়া এ থেকে সাইনুসাইটিস, চোখের কনজাংটিভাইটিস, নাকের পলিপও হতে পারে। • মৃত্যু ঘটাও অস্বাভাবিক নয়। একসময় ধারণা ছিল, অ্যালার্জি হলে আর ভালো হয় না। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সে ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। হাতুড়ে ডাক্তারের খপ্পরে পড়ে ভুল চিকিৎসা দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার সৃষ্টি করে, এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে। নিজে নিজে অথবা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে অ্যালার্জির চিকিৎসা করা ঠিক নয়। অ্যালার্জির চিকিৎসা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ, ত্বক ও অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে নিতে হবে। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ১. স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইট http://www.mohfw.gov.bd/ ২. আইসিডিডিআরবি এর ওয়েবসাইট http://www.icddrb.org/ ‘আন্তর্জাতিক উদরাময় নিরাময় সংস্থা’ বা ‘আইসিডিডিআরবির’ অফিশিয়াল সাইট। এ সাইটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস, কর্মকৌশল এবং গবেষণা সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে এ সাইটে। বন্যার পূর্বাভাস ও সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সব ধরনের খবর এবং এমতাবস্তায় যে কোন সংক্রমণ রোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে পারবেন এ সাইট থেকে। ৩. আপনার ডক্টর http://www.apnardoctor.com/index.php স্বাস্থ্যসেবার জন্য সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় করা একটি ওয়েবসাইট। এ ওয়েবসাইটে স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য যেমন জরুরী চিকিৎসা, রোগ সতর্কীকরণ, বিভিন্ন রোগের লক্ষণ, বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ, বিভিন্ন ডাক্তার, প্যাথলজী, হাসপাতাল, ঔষধ প্রস্তুক কারক এর ঠিকানা, জরুরী সাহায্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর, রয়েছে। এ ওয়েব সাইটে একটি স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র রয়েছে যেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যার জন্য পরামর্শ নেওয়া যাবে। ৪. বাংলাদেশ ভার্চুয়াল রক্ত ব্যাংক http://www.rokto.org/ এ ওয়েব সাইটে রক্ত দাতাদের একটি ডাটাবেজ আছে। এখানে যে কোন রক্তদাতা বিনামূল্যে রক্ত দানের উদ্দেশ্যে নিবন্ধন করতে পারবেন। এখানে সদস্য এমন কারো যদি নির্দিষ্ট কোন গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন হয় তাহলে এ সাইটে নিবন্ধিত ঐ গ্রুপের রক্তদাতার অনুসন্ধান করা যাবে। রক্তদাতা না পাওয়া গেলে এ ওয়েবসাইটে ঐ নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপের জন্য আবেদন করা যাবে। এ সাইটে রক্ত বিক্রিকে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। ৫. এমবিবিএসডক্টর এর ওয়েবসাইট www.mbbsdoctor.com এই ওয়েবসাইটে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক বিভিন্ন রোগের উপসর্গ, লক্ষণ ও তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া এ ওয়েব সাইটে বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, ডাইগনষ্টিক সেন্টার, ব্লাড ব্যাংক ও ঔষধের দোকানের ঠিকানা ও ফোন নাম্বার পাওয়া যাবে। ওয়েব সাইটটি বাংলা এবং ইংরেজী দুই ভাষাতেই রয়েছে। তবে ওয়েব সাইটটিতে শুধু ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার দ্বারাই বাংলা দেখা যাবে। ৬. ডক্টরসবিডি http://www.doctorsbd.com/ এ ওয়েব সাইটে বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার, ঔষধের দোকান প্রভৃতি স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য রয়েছে। ৭. স্বাস্থ্যকথা http://health.amardesh.com/ এ ওয়েব সাইটে বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন রোগ তার উপসর্গ এবং চিকিৎসা সম্পর্কিত লেখা সমূহ বিভিন্ন বিষয়শ্রেণী অনুযায়ী সাজানো রয়েছে। ফরমালিন কি এবং এ থেকে বাঁচার উপায়! ফরমালিন কি? ফর্মালিন (-CHO-)n হল ফর্মালডিহাইডের (CH2O) পলিমার। ফর্মালডিহাইড দেখতে সাদা পাউডারের মত। পানিতে সহজেই দ্রবনীয়। শতকরা ৩০-৪০ ভাগ ফর্মালিনের জলীয় দ্রবনকে ফর্মালিন হিসাবে ধরা হয়। ফর্মালিন সাধারণত: টেক্সটাইল, প্লাষ্টিক, পেপার, রং, কনস্ট্রাকশন ও মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালিনের ক্ষতিকর দিক • ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। • তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। • ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেন সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়। • ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। এতে মৃত্যু অনিবার্য। • মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে। • ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে। • গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে। • এ ধরনের খাদ্য খেয়ে অনেকে আগের তুলনায় এখন কিডনি, লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, কয়েক দিন পরপর একই রোগী ডায়রিয়ায় ভুগছেন, পেটের পীড়া ভালো হচ্ছে না, চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিভাবে মাছ থেকে ফর্মালিনের দূর করবেন? • পরীক্ষায় দেখা গেছে পানিতে প্রায় ১ ঘন্টা মাছ ভিজিয়ে রাখলে ফর্মালিনের মাত্রা শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়। • লবনাক্ত পানিতে ফর্মালিন দেওয়া মাছ ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ফর্মালিনের মাত্রা কমে যায়। • প্রথমে চাল ধোয়া পানিতে ও পরে সাধারণ পানিতে ফর্মালিন যুক্ত মাছ ধুলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ ফর্মালিন দূর হয়। • সবচাইতে ভাল পদ্ধতি হল ভিনেগার ও পানির মিশ্রনে (পানিতে ১০ % আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট মাছ ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ফর্মালিনই দূর হয়। কিভাবে ফল ও সবজি থেকে ফর্মালিনের দূর করবেন? • খাওয়ার আগে ১০ মিনিট গরম লবণ পানিতে ফল ও সবজি ভিজিয়ে রাখতে হবে। সূত্রঃ ইন্টারনেট থেকে নেয়া। তথ্যসূত্র : http://bornelegant.wordpress.com
Thursday, 12 August 2010 | 5618 hits
সেমি-অর্গানিক চাষাবাদ/শাক-সবজি চাষাবাদ
পরিচিতি ইংরেজি নামঃ Lady's finger/Okra বৈজ্ঞানিক নামঃ Hibiscus esculentus গ্রীষ্মকালীন সবজি হিসেবে বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের লোকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এটি মূলত: ভাজি, ভর্তা এবং তরকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঢেঁড়শে যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ, ভিটামিন এ, বি, সি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, লৌহ ও আয়োডিন রয়েছে। ঢেঁড়শ হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ছবি জাত ১. বারি ঢেঁড়শ-১ ‘বারি ঢেঁড়শ -১’ জাত  এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত 'বারি ঢেঁড়শ-১' নামে এ জাতটি ১৯৯৬ সালে অনুমোদন করা হয়, এটি ‘হলুদ শিরা রোগ প্রতিরোধী’ ঢেঁড়শের নতুন । এ জাতের গাছে প্রায় সব ডালে ফুল ও ফল ধরে। গাছ সাড়ে ছয় ফুট থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছপ্রতি ফলের সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০টি হতে দেখা যায়। বৈশিষ্ট্য:     • বীজ বপনের ৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ফুটতে শুরু করে। • গাছ খাড়া; প্রধান কান্ড থেকে ২ থেকে ৩ টি শাখা বের হয়। • ফল ৫ শিরা বিশিষ্ট, সবুজ এবং দৈর্ঘ্যে ৫.৫ থেকে ৭ ইঞ্চি লম্বা হয় এবং এর গায়ে ছোট ছোট নরম লোম দেখা যায়। • পানি জমে থাকে এমন জায়গাতেও এটি বেঁচে থাকে। • ফুল ফোটার ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করতে হয় এবং পরবর্তীতে প্রতি ১ দিন পর পর ফল সংগ্রহ করা যায়। • এ জাত হলুদশিরা ভাইরাস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন। • পরিপক্ক এবং শুকনো বীজে বাদামি রোমশ আবরণ আছে যা এ জাতের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। • প্রতি শতাংশে ৫৫ থেকে ৬৫ কেজি ফলন পাওয়া যায়।      ঢেঁড়শ চাষের সুবিধা • অল্প সময়ে ফসল পাওয়া যায়। • ঢেঁড়শের চাষ সারা বছর করা যায়। • দাম ভাল পাওয়া যায়। স্হান নির্বাচন/চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি স্হান নির্বাচন উঁচু,মাঝারী উঁচু,বৃষ্টির পানি জমে না এবং সারাদিন রৌদ্র পায় এমন স্হানে ঢেঁড়শের চাষ করা উচিত। চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি জলবায়ু তাপমাত্রা মাটির ধরণ শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় আবহাওয়ায় ঢেঁড়শ জন্মানো যায়। সঠিক বৃদ্ধি ও গুনগতমানের ঢেঁড়শের জন্য ২৪০ থেকে ৩০০ সে. তাপমাত্রা প্রয়োজন। তবে ৩৫০ সে. তাপমাত্রায়ও ঢেঁড়শ ফলানো সম্ভব। পানি জমে না এমন এবং পর্যাপ্ত জবসার মিশ্রিত বেলে দো-আঁশ, কর্দম দো-আঁশ এবং দো-আঁশ মাটিতে ঢেঁড়শ ফলানো যায়। তবে অধিক জৈবসার মিশ্রিত হালকা এবং ভঙ্গুর দো-আঁশ মাটি (হাত দিয়ে সহজে ভাঙা যায় এমন মাটি) ঢেঁড়শের জন্য ভাল। প্রচুর জৈব সার প্রয়োগ করতে পারলে বেলে মাটিতেও এর চাষ করা যায়।   জমি তৈরি/রোপণ পদ্ধতি জমি তৈরি • ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় লাঙ্গল বা পাওয়ার টিলারের মাধ্যমে ৫ থেকে ৬টি আড়াআড়ি চাষ এবং সমানসংখ্যক মই দিয়ে ভালোভাবে চাষ দিয়ে জমিকে তৈরি করতে হবে। • জমি চাষের সময়ে মাটির নীচের পোকার আক্রমণ ও ছত্রাকজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাবার জন্য আগাছা সমূহ পরিষ্কার করে নিতে হবে। • মই দিয়ে জমিকে সমতল করে নিতে হবে। • শেষ চাষের পূর্বে জৈবসার ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। শস্যপর্যায় অবলম্বন (ঢেঁড়শ চাষের আগে করণীয়) ঢেঁড়শ আবাদে ভূট্টা, মটরশুঁটি, গোলআলু এবং বাঁধাকপি'র সাথে কোনভাবেই শস্যপর্যায় অবলম্বন করা যাবেনা। একইভাবে পোকা-মাকড় এবং রোগবালাই এর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ঢেঁড়শের জমিতে আগে ও পরে তুলা চাষ করা যাবে না। বীজ বপন সময় অতিরিক্ত ঠাণ্ডার সময় ছাড়া সারাবছরই ঢেঁড়শ চাষ করা সম্ভব। তবে ফেব্রুয়ারী থেকে জুন মাসে রোপণ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। খরিফ-১ মৌসুমে ঢেঁড়শ চাষের জন্য মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ, খরিফ-২ মৌসুমে চাষের জন্য মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মে, রবি -মৌসুমে চাষের জন্য মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে। বীজের পরিমাণ আবহাওয়ার তারতম্যে বীজ থেকে বীজের দূরত্ব কম-বেশি হযে থাকে। সেজন্য গ্রীষ্মকালে একর প্রতি ৫ থেকে ৬ কেজি এবং শীতকালে ৩.৫ থেকে ৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ লাগানোর পূর্বে ১২ থেকে ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে নিলে সহজে গজায়। বীজ রোপণের আগে বীজের গায়ের পানি শুকিয়ে নিতে হবে। রোপণ পদ্ধতি • চাষ দেওয়া জমিতে গ্রীষ্মকালে ১ থেকে ১.৫ ফুট এবং শীতকালে ১.৫ থেকে ২ ফুট দূরত্বে ৬ ইঞ্চি উচ্চতায় পর পর সারি তৈরি করে নিতে হবে। • সারির চূড়ায় ১ ইঞ্চি গভীরতায় ১ থেকে ২টি বীজ গ্রীষ্মকালে ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি এবং শীতকালে ১৪ থেকে ১৮ ইঞ্চি দূরত্বে রোপণ করতে হবে। • বীজ রোপণের পর মাটি শুষ্ক থাকলে নালায় হালকা সেচ দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন কোনভাবেই নালার তিন ভাগের দুই ভাগ এর বেশি পানি না উঠে। • কোনভাবেই ভেজা জমিতে বীজ লাগানো/রোপণ করা যাবে না। আন্তঃপরিচর্যা আগাছা দমন গাছের দৈহিক বৃদ্ধি,সারের অপচয় রোধ এবং অধিক ফলনের জন্য আগাছা দমন অপরিহার্য। চারা গজাবার পর হাত দিয়ে সতর্কতার সাথে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। নিড়ানীর মাধ্যমে আগাছা পরিষ্কার করার সময়ে গাছের শিকড়ের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেচ প্রয়োগ গাছের স্বাস্হ্য,সুষম বৃদ্ধি,একই রকম গঠন এবং গুণগতমান বজায় রাখার জন্য মাটিতে উপযুক্ত পরিমাণে আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন। মাটির জলীয় রসের অভাব হলে ফুল এবং ফলন কমে যায়। মাটির আদ্রতার উপর নির্ভর করে জমিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। নালায় সেচ দেয়া ভাল,কোন ক্রমেই ভাসমান সেচ দেয়া যাবে না। অতিরিক্ত সেচের/বৃষ্টির পানি দ্রুত নালার মাধ্যমে বের করার ব্যবস্হা নিতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি দেয়া পরিচর্যা,ফসল সংগ্রহ এমন কি পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়ার জন্য ঢেঁড়শ সারিতে বপন করা ভাল। আগাছা দমন,সেচের সুবিধা এবং পানি চলাচলের জন্য নালা তৈরি করার সময়ে গাছের গোড়ায় মাটি দিতে হবে। ফলে গাছ হেলে পড়ার সম্ভাবনা থাকেনা এবং ছত্রাকজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যায়। বীজ উৎপাদন একই জাতের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে বীজ ফসলের জন্য নির্ধারিত জমির অন্তত: প্রায় ৩৩০ ফুটের মধ্যে অন্য কোন জাতের ঢেঁড়শ চাষ করা উচিত হবে না। তবে কীট-পতঙ্গের আনাগোনা বেশি হলে এ দূরত্ব ৬৬০ ফুট করা প্রয়োজন। একই জাতের সুনির্দিষ্ট বশিষ্ট্য সম্পন্ন গাছ ছাড়া অন্য সকল গাছ এবং হলুদ শিরা ভাইরাস বা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত সব গাছই জমি থেকে উঠিয়ে ফেলতে হবে। বীজ ফসলে সাদা মাছি পোকার আক্রমণ দেখা দিলে দমনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহণ করতে হবে। পাকা ফল যখন সবুজ রং হারিয়ে ফেলে এবং শক্ত হয় তখন তুলে এক সপ্তাহ শুকিয়ে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। সার প্রয়োগ জৈবসার জমিতে যত বেশি ব্যবহার করা যায়, তত ভালো হয়। জৈবসারের জন্য যে সব জিনিসগুলো ব্যবহার করতে পারি সেগুলো হলো - ১. গোবর ২. খামারজাত সার ৩. কম্পোস্ট ৪. লতাপাতা ৫. খৈল ৬. ছাই প্রতি শতকের জন্য ৫০ থেকে ১শ কেজি পচাগোবর/খামারজাত সার/কম্পোস্ট বা যে কোন জৈবসার দিতে হবে। প্রতিশতকে ১০ থেকে ১৫ কেজি খৈল ব্যবহার করা যায়। প্রতিশতকে ৫ থেকে ৭ কেজি ছাই ব্যবহার করা যায়। তবে জৈবসারের মাত্রা হলো “যত বেশি তত ভালো”।          জমিতে ব্যবহারের জন্য গোবর ও খৈল প্রস্তুত করা পচা গোবর ও ৩/৫ দিন পচানো খৈল সরাসরি জমিতে দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তবে খৈল পুরো জমিতে না দিয়ে চারা রোপণের গর্তে দিলে লাভ বেশি হবে। খৈল প্রয়োগের আগে দেখতে হবে খৈল ভালোভাবে পচেছে কিনা। ঝাঁঝালো গন্ধ আছে কি না। গন্ধযুক্ত খৈল দিলে চারা মরে যাবে। মনে রাখতে হবে “কাঁচা গোবর বিষ - পচা গোবর সার”। জমিতে ব্যবহারের জন্য লতাপাতা প্রস্তুত করা লতাপাতা যেমন কচুরীপানা বা এ জাতীয় গাছগুলো প্রথমে শুকাতে হবে পরে গর্ত করে বা স্তুপ পদ্ধতি অবলম্বন করে পঁচিয়ে নিতে হবে। ভালোভাবে পঁচলেই কেবল জমিতে ব্যবহার করতে  হবে। কম পঁচানো জৈবসার মাটিতে দিলে মাটি বিষাক্ত হবে ও ফলনে ব্যাঘাত ঘটবে। জমিতে ব্যবহারের জন্য খামারজাত সার প্রস্তুত করা প্রথমে বড় একটি গর্ত করতে হবে। গর্তটির ২টি চেম্বার থাকবে। একটি চেম্বার ঘরের যাবতীয় আবর্জনা লতাপাতা তরকারির উচ্ছিষ্ট অংশ, ঘর ঝাড়ু দেয়া অংশ, ঘাস, ডিমের খোসা, মাছের কাটা, মাংসের হাড্ডি এমনকি বাচ্চাদের পায়খানা অর্থ্যাৎ চুল ও পলিথিন বাদ দিয়ে সব পচনশীল আবর্জনা প্রতিদিন জমা করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একমুঠ (৫০ গ্রাম) ইউরিয়া এবং একমুঠ (৫০ গ্রাম) টিএসপি জমাকৃত আবর্জনার মধ্যে ছিটিয়ে দিতে হবে। এত জৈব সারের পচনক্রিয়া দ্রুত হবে। চেম্বার উপর কাঠ, টিন, এডভেস্টর বা পাতার ছাউনি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এভাবে জমা করে রাখা আবর্জনা ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর পাশের চেম্বার নিয়ে যেতে হবে। নতুন চেম্বার আগের চেম্বারের আবর্জনা। দ্বিতীয় চেম্বারে ৩০ থেকে ৩৫ দিন আবর্জনা রাখার পর এ সব সার  যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়ে যাবে।  যে কোন জমিতে যে কোন ফসলের জন্য যত বেশি পরিমাণ পাওয়া যায় ব্যবহার করা যাবে। পোকামাকড় ও রোগবালাই পোকামাকড় পোকার নাম লক্ষণ প্রতিকার পাতা মোড়ানো পোকা এ পোকার কীড়া পাতা মুড়ে তার ভিতরে বাস করে এবং পাতার সবুজ অংশ খেয়ে নষ্ট করে। ১. নিয়মিত ফসলের উপর নজর রাখতে হবে। ২. আক্রান্ত পাতাসমূহ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৩. নিমজাতীয় জৈব কীটনাশক ছিটিয়ে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জাব পোকা নরম শরীরের সবুজ থেকে কালো বর্ণের অতিক্ষুদ্র এই পোকাটি পাতার নীচের অংশে দলবদ্ধভাবে অবস্হান করতে দেখা যায়। এরা কচিপাতা, কাণ্ড এবং ফল থেকে রস শোষণ করে। ফলে পাতা বিবর্ণ হয়ে বেঁকে যায় এবং গাছ খাটো হয় ও ফলন কমে যায়। জাবপোকা ভাইরাস রোগের জীবাণু আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্হ গাছে ছড়িয়ে দেয়। ১. নিয়মিত ফসলের উপর নজর রাখতে হবে। ২. আক্রান্ত পাতাসমূহ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৩. নিমজাতীয় জৈব কীটনাশক ছিটিয়ে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জেসিড পোকা প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক উভয় প্রকারের এই পোকাটি প্রধানত: কচি পাতার রস শোষণ করে এবং পাতায় বিষাক্ত একটি দ্রব্য প্রবেশ করায়। দিনের বেলায় পাতার নীচের অংশে অবস্হান করে। আক্রান্ত পাতা ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং পাতার কিনারাসমূহ নীচের দিকে বেঁকে যায়। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত পাতাসমূহ পরবর্তীতে শুকিয়ে পড়ে যায়। ১. নিয়মিত ফসলের উপর নজর রাখতে হবে।   ২. আক্রান্ত পাতাসমূহ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৩. নিমজাতীয় জৈব কীটনাশক ছিটিয়ে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ঢেঁড়শের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা ডিম থেকে বাদামী রংয়ের কীড়া বের হয়ে ডগা ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে নরম অংশ ধীরে ধীরে খায়। আক্রান্তের ডগা নেতিয়ে পড়ে ও শুকিয়ে যায়, ফলে গাছের বৃদ্ধি ঠিক ভাবে হয় না। কীড়া ফল ছিদ্র করে ভিতরে খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। তাই ফল বাজারজাতকরণের অনুপযুক্ত হয়ে যায়। বেশি আক্রমণ করলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। ১. সপ্তাহে একবার মরা বা নেতিয়ে পড়া ডগা, আক্রান্ত ফুল ও ফল সংগ্রহ করে কমপক্ষে একহাত গভীর গর্ত করে পুতে ফেলতে হবে। ২. পোকার কীড়া বা পুত্তলি ধ্বংস করা। ৩. বিকল্প পোষক গাছ যেমন তুলার আবাদ ঢেঁড়শের জমির কাছাকাছি না করা। সাদা মাছি পোকা পাখা বিশিষ্ট ক্ষুদ্র সাদা মাছি পোকাসমূহ পাতার নীচের অংশ খায় এবং রস শোষণ করে। এদের সরাসরি খাওয়া/রস শোষণের ফলে গাছের তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি না হলেও ইহারা আক্রান্ত গাছ থেকে রস শোষণ করে হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগের জীবাণু ছড়ায়। ফলে পাতাসমূহ বেঁকে শুকিয়ে যায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ইহার ফলে ফলন কমে যায়। ১. নিয়মিত ফসলের উপর নজর রাখতে হবে।   ২. আগাছা দমন করে জমি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; ৩. প্রাথমিক পর্যায়ে নিমজাতীয় কীটনাশক ছিটিয়ে দমন করা সম্ভব; মাকড় বাদামী বর্ণের অতিক্ষুদ্র এই প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক মাকড়গুলো দলবদ্ধভাবে পাতার নীচে অবস্হান করে। ইহার ফলে পাতায় ক্ষতচিহ্নের সৃষ্টি হয় এবং পাতাসমূহ হলুদ থেকে সাদা বর্ণ ধারণ করে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়। পাতাসমূহ শুকিয়ে ঝরে পড়ে। ফলে ফলন অনেক কমে যায়। ১. নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং বিকল্প আবাস স্হল সরিয়ে ফেলতে হবে। ২. মারাত্মকভাবে আক্রান্ত পাতাসমূহ পুড়ে ফেলতে হবে। পাতার হপার পোকা এ পোকার ব্যাপক আক্রমণে ঢেঁড়শ গাছ মারা যেতে পারে এবং ফলশ্রুতিতে ফলন কমে যেতে পারে। পূর্ণবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক পোকা পাতার রস চুষে খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। পাতার রস চুষার সময় এদের লালা গ্রন্হি থেকে বিষাক্ত রস বেরিয়ে আসে যা গাছের পাতাকে প্রথমে কুঁকড়িয়ে ফেলে। পরে ঐ পাতার কিনারা লাল হয়ে যায়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে সম্পূর্ণ পাতা লাল হয়ে যায়, পুড়ে যাওয়ার মত দেখায় এবং পাতা ঝরে পড়ে। এই পোকা গাছের পাতার রস খাওয়ার পাশাপাশি মধুর মত এক রকম রস বের করে। এই রস পাতায় আটকে গেলে সুটিমোল্ড নামক এক প্রকার কালো রং এর ছত্রাক জন্মায় ফলে গাছে সূর্যের আলো ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারেনা এবং গাছের খাদ্য ঠিকমতো তৈরি হয়না। ১. নিমতেল ১০ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতার নীচের দিকে স্প্রে করা। ২. এক কেজি আধা ভাঙ্গা নিম বীজ ২০ লিটার পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি পাতার নীচের দিকে স্প্রে করা। ৩. ৫ গ্রাম পরিমাণ গুঁড়া সাবান প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতার নীচের দিকে স্প্রে করা। রোগবালাই রোগবালাই লক্ষণ/চেনার উপায় প্রতিকার ঢলে পড়া রোগ মাটি বাহিত ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ। এর আক্রমণে অতিদ্রুত ঢেঁড়শের চারা মারা যায়। মাটি এবং আক্রান্ত ফসলের কোন অংশ পড়ে থাকলে, তা থেকে এই রোগের বিস্তার ঘটে। আক্রান্তের ফলে গাছের পাতাসমূহের কিনারা থেকে হলুদ হতে শুরু করে এবং দ্রুত গাছ মারা যায়। গাছের কাণ্ড কেটে স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসের পানিতে রাখলে পানি ঘোলা হয়ে যায়। এভাবে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়। ১. মাটিকে শোধন করে নিতে হবে; ২. প্রতিরোধক ক্ষমতাসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে হবে; ৩. শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে; ৪. জমি থেকে ফসলের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে; ৫. আক্রান্তকালীন সময়ে সেচ প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে; পাউডারী মিলডিউ এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। আদ্র ও গরম আবহাওয়া এই রোগ বিস্তারে সহায়ক। গাছের পাতার উপরের অংশে প্রথম সাদা পাউডার আকারে দেখা দেয়, পরবর্তীতে উভয় অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে। সহজে বাতাসের মাধ্যমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়িয়ে পড়ে। ১. প্রতিরোধক ক্ষমতাসম্পন্ন পুষ্ট বীজ ব্যবহার করতে হবে; ২. আক্রান্ত এবং ভাল জমিতে চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৩. আক্রান্ত পাতাসমুহ সাবধানতার সঙ্গে সংগ্রহ করে মাটির নীচে বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে; হলুদ মোজাইক ভাইরাস এটি একটি বীজবাহিত রোগ। আক্রান্ত পাতার শিকড়সমূহ এবং সমস্ত পাতা হলুদ রং ধারণ করে। আক্রান্ত গাছে ফুল ও ফল ধরার হার কমে যায় এবং গাছ খাটো হয়ে যায়। ১. প্রতিরোধক ক্ষমতাসম্পন্ন পুষ্ট বীজ ব্যবহার করতে হবে;   ২. আক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করা যাবে না; ৩. শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে; ৪. আক্রান্ত গাছ মাটিসহ উপড়ে ফেলে মাটি চাপা দিতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পাতার দাগপড়া রোগ এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। ঢেঁড়শের আবাদকৃত এলাকায় এই রোগ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। আক্রান্ত পাতা থেকে এই রোগ অন্য পাতায় ছড়ায়। প্রথমত: আক্রান্ত পাতার নীচের অংশে ধূসর দাগ দেখা যায় এবং পরবর্তীতে আস্তে আস্তে দাগসমূহ কালো রং ধারণ করে। ১. প্রতিরোধক ক্ষমতাসম্পন্ন পুষ্ট বীজ ব্যবহার করতে হবে; ২. বপনের পূর্বে বীজ ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধন করে নিতে হবে; ৩. জমি থেকে ফসলের বাকী অংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে; ৪. শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে;   ফসল সংগ্রহ/ফলন/মোড়কীকরণ/ফসল সংগ্রহের পর করণীয়/সংরক্ষণ ফসল সংগ্রহ • ফেব্রুয়ারি-মার্চে বীজ বপন করলে ৪০ থেকে ৪৫ দিনে এবং এর পর বীজ বপন করলে ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে ফুল ফুটতে শুরু করে। তবে জাতভেদে কোন কোন সময় একটু দেরী হতে পারে। • ঢেঁড়শের ফল সংগ্রহের সময় নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত: ফুলের পরাগায়নের ৭ থেকে ৮ দিন পর ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। এ পর্যায়ে জাত অনুযায়ী ফল দৈর্ঘ্যে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি হয়ে থাকে। • ফলের বয়স ১০ দিনের বেশি হলে ফলে আঁশের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং পুষ্টিমাণ কমে যায়। • ফল যত সংগ্রহ করা যায় গাছ হতে তত বেশি ফল পাওয়া যায়। একদিন পর পর এবং সম্ভব হলে প্রতিদিনই ঢেঁড়শের ক্ষেত থেকে ফল সংগ্রহ করা উচিত। সবজির জন্য ফসল সংগ্রহ চারা গজানোর ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর ঢেঁড়শ গাছ ফুল দিতে শুরু করে। ফুল বের হওয়ার ৩ দিন (গ্রীষ্মকাল) এবং ৫ দিন (শীতকাল) পর ঢেঁড়শ ২.৫ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। এ সময় থেকেই ঢেঁড়শ সংগ্রহ শুরু করা যেতে পারে। ঢেঁড়শ কাঁচি বা চাকু বা ব্লেড দ্বারা সংগ্রহ করা ভাল। ফল সংগ্রহের সময় হাতে গ্লাভস্‌ বা রাবারের হাত মোজা পড়ে নিলে ভাল এবং ফলের বোঁটায় ধরে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে ফলের গায়ে কোন দাগ পড়বে না। ফলন উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে ঢেঁড়শের ফলন একর প্রতি ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কেজি অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ১২৫০০ থেকে ১৫০০০ কেজি (৫০ থেকে ৬০ কেজি/শতাংশ) পাওয়া সম্ভব। বীজের ফলন সময়মত সঠিক পরিচর্যা গ্রহণ করলে একর প্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ কেজি (৬ থেকে ৮ কেজি/শতাংশ) বীজ পাওয়া যায়। ফসল সংগ্রহের পর করণীয় সকালে অথবা বিকালে যখন রৌদ্রের তীব্রতা থাকে না তখন ফসল সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহকৃত ফসল প্লাস্টিক পাত্রে সংরক্ষণ করলে এর গায়ে কোন প্রকার আঁচড় লাগবে না। সংগ্রহের সময় পোকায় খাওয়া, বাঁকা এবং বাতিলযোগ্য ফসলগুলোকে আলাদা করে নিতে হবে। এর ফলে ফসলের গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে এবং বেশি দাম পাওয়া যাবে। বীজ সংরক্ষণ বীজের জন্য ফসল সংগ্রহ : রোগ-জীবাণু এবং পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করা যাবে না। বীজ বপনের প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ দিনের মধ্যে ঢেঁড়শগুলো শুকিয়ে লম্বালম্বিভাবে ফাটতে শুরু করে। এ সময়ে ধারালো ছুরি দিয়ে পাকা ফলগুলো সংগ্রহ করে রৌদ্রে ভাল করে শুকিয়ে মাড়াই বা লাঠি দ্বারা হালকাভাবে আঘাত করে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহকৃত বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে পরবর্তীতে ঠাণ্ডা করে প্লাস্টিক ব্যাগে, মাটির পাত্রে বা টিনে ভরে সংরক্ষণ করতে হবে। পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য শুকনো নিমপাতা বা বিষকাটালীর পাতা পাত্রের মুখে দিয়ে ভালোভাবে আটকিয়ে দিতে হবে যেন বাতাস প্রবেশ না করতে পারে।
Tuesday, 20 March 2012 | 9 hits
সেমি-অর্গানিক চাষাবাদ/শাক-সবজি চাষাবাদ
ভূমিকা বাংলাদেশে করলা একটি অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় সবজি। বাংলাদেশের মাটি এবং আবহাওয়া করলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এজন্য দেশের সর্বত্র কম-বেশি করলা চাষ হয়ে থাকে। Cucurbitaceae পরিবারের এই ফসলটির বৈজ্ঞানিক নাম Momordica charantia. ইংরেজিতে Bitter gourd বলা হয়। জাত ও বপন সময় জাত বপন সময় ‘বারি করলা’ ফেব্রুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর মাস   পরিবেশ ও মাটি/বীজের উৎস/জমি তৈরি চাষের উপযোগী পরিবেশ ও মাটি: জলবায়ু তাপমাত্রা মাটির প্রকৃতি উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু ২০-৩০ ডিগ্রি সে. সুনিষ্কাশিত জৈব সার সমৃদ্ধ দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি। বীজের উৎস বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান বা সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত সংস্হার অনুমোদিত বীজ ব্যবসায়ী/ডিলার থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। বি:দ্র: বীজ সংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্য আলাদাভাবে সংযোজন করা হয়েছে। জমি তৈরি করলা চাষের জন্য পানি জমে না এমন জায়গা নির্বাচন করা উচিত। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য প্রথমে জমি ভাল করে আড়াআড়িভাবে চাষ ও মই দিয়ে সমতল করে নিতে হয় এবং সেচ দেবার এবং অতিরিক্ত পানি সুনিষ্কাশনের সুবিধার্থে নির্দিষ্ট দূরত্বে নালা কেটে কয়েক ভাগ করে নিতে হয়। মাদা তৈরি/বীজ বপন উচ্ছে ও করলার বীজ মাদায় বা সারিতে বোনা উত্তম । নিম্নে মাদায় বীজ বপনের ধাপ সমূহ দেখানো হলো: বীজ বপনের পদ্ধতি ১. মাদায় বীজ বপন করতে হলে ১০ দিন আগে নির্দিষ্ট মাপের গর্ত তৈরি করে জৈব/গোবর সার ও অন্যান্য সার মিশ্রিত মাটি দ্বারা পূর্ণ করে দিতে হবে। ২. উচ্ছে ও করলার জন্য সাধারণত: ১ একরে বীজের প্রয়োজন যথাক্রমে ১.২ কেজি ও ৩ কেজি। মাদা তৈরি আকার ৪০ × ৪০ × ৪০ সেমি বীজের পরিমাণ (প্রতি মাদায়) ২/৩ টি মাদার দূরত্ব ২ মিটার বা ৬ ফুট সারির দূরত্ব ১.৫-২ মিটার বা ৪.৫-৬ ফুট কত দিন পর চারা বের হবে ৩-৪ দিন পর পরামর্শঃ বীজ বপনের পূর্বে বীজ ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে নিতে হবে- ১. প্রতি মাদা থেকে অপেক্ষাকৃত সবল চারাটি রেখে অতিরিক্ত ১/২টি চারা উঠিয়ে ফেলতে হবে। ২. পলিথিনে চারা তৈরি করেও মাদায় রোপণ করা যেতে পারে,এতে বীজের পরিমাণ হ্রাস পাবে। সার প্রয়োগ জৈবসার জমিতে যত বেশি ব্যবহার করা যায়, তত ভালো হয়। জৈবসারের জন্য যে সব জিনিসগুলো ব্যবহার করতে পারি সেগুলো হলো - ১. গোবর ২. খামারজাত সার ৩. কম্পোস্ট ৪. লতাপাতা ৫. খৈল ৬. ছাই প্রতি শতকের জন্য ৫০ থেকে ১শ কেজি পচাগোবর/খামারজাত সার/কম্পোস্ট বা যে কোন জৈবসার দিতে হবে। প্রতিশতকে ১০ থেকে ১৫ কেজি খৈল ব্যবহার করা যায়। প্রতিশতকে ৫ থেকে ৭ কেজি ছাই ব্যবহার করা যায়। তবে জৈবসারের মাত্রা হলো “যত বেশি তত ভালো”।          জমিতে ব্যবহারের জন্য গোবর ও খৈল প্রস্তুত করা পচা গোবর ও ৩/৫ দিন পচানো খৈল সরাসরি জমিতে দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তবে খৈল পুরো জমিতে না দিয়ে চারা রোপণের গর্তে দিলে লাভ বেশি হবে। খৈল প্রয়োগের আগে দেখতে হবে খৈল ভালোভাবে পচেছে কিনা। ঝাঁঝালো গন্ধ আছে কি না। গন্ধযুক্ত খৈল দিলে চারা মরে যাবে। মনে রাখতে হবে “কাঁচা গোবর বিষ - পচা গোবর সার”। জমিতে ব্যবহারের জন্য লতাপাতা প্রস্তুত করা লতাপাতা যেমন কচুরীপানা বা এ জাতীয় গাছগুলো প্রথমে শুকাতে হবে পরে গর্ত করে বা স্তুপ পদ্ধতি অবলম্বন করে পচিয়ে নিতে হবে। ভালোভাবে পচলেই কেবল জমিতে ব্যবহার করতে হবে। কম পচানো জৈবসার মাটিতে দিলে মাটি বিষাক্ত হবে ও ফলনে ব্যাঘাত ঘটবে।   জমিতে ব্যবহারের জন্য খামারজাত সার প্রস্তুত করা প্রথমে বড় একটি গর্ত করতে হবে। গর্তটির ২টি চেম্বার থাকবে। একটি চেম্বার ঘরের যাবতীয় আবর্জনা লতাপাতা তরকারির উচ্ছিষ্ট অংশ, ঘর ঝাড়ু দেয়া অংশ, ঘাস, ডিমের খোসা, মাছের কাটা, মাংসের হাড্ডি এমনকি বাচ্চাদের পায়খানা অর্থ্যাৎ চুল ও পলিথিন বাদ দিয়ে সব পচনশীল আবর্জনা প্রতিদিন জমা করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একমুঠ (৫০ গ্রাম) ইউরিয়া এবং একমুঠ (৫০ গ্রাম) টিএসপি জমাকৃত আবর্জনার মধ্যে ছিটিয়ে দিতে হবে। এতে জৈব সারের পচনক্রিয়া দ্রুত হবে। চেম্বার উপর কাঠ, টিন, এডভেস্টর বা পাতার ছাউনি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এভাবে জমা করে রাখা আবর্জনা ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর পাশের চেম্বার নিয়ে যেতে হবে। নতুন চেম্বার আগের চেম্বারের আবর্জনা। দ্বিতীয় চেম্বারে ৩০ থেকে ৩৫ দিন আবর্জনা রাখার পর এ সব সার  যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়ে যাবে। যে কোন জমিতে যে কোন ফসলের জন্য যত বেশি পরিমাণ পাওয়া যায় ব্যবহার করা যাবে। জমির পরিচর্যা গাছের বৃদ্ধির জন্য করলা চাষের ক্ষেত্রে বাউনি দেওয়া আবশ্যক। কৃষক সাধারণত: উচ্ছে চাষে বাউনি ব্যবহার করেনা,তার বদলে মাদা বা সারির চারপাশের জমি খড় দিয়ে ঢেকে দেয়। উচ্ছের গাছ খাটো বলে এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বর্ষাকালে এ পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। গাছের গোড়া থেকে ডালপালা বের হলে সেগুলো কেটে দিতে হয়। এছাড়া পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য করলার জমিকে আগাছামুক্ত রাখতে হয়। পোকামাক ও রোগবালাই পোকামাকড় পোকার নাম লক্ষণ প্রতিকার ফলের মাছি পোকা কচি ফলের নীচে খোসায় এ পোকা ডিম পারে এবং ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফল খেয়ে নষ্ট করে। ১. হলুদ আলোর ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। ২. আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে অথবা মাটির নীচে চাপা দিয়ে রাখতে হবে। লাল কুমড়া বিটল পূর্ণ বয়স্ক পোকা কচি পাতা ও ফল খেয়ে ফেলে। পোকা গুলো কান্ড বা পাতার নীচে থাকে। ১. এজন্য জমি সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ২. নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ৩. সকাল এবং বিকালে হাত দিয়ে পোকা ধরে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৪. আক্রান্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নিম’ জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। জাব পোকা কচি পাতা, ফুল ও ফলের রস শোষন করে। এতে ফসলের ক্ষতি হয় এবং ফলন কমে যায়। ১. নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ২. আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পিষে ধ্বংস করে ফলতে হবে। ৩. আক্রান্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নিম’ জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। রোগবালাই রোগের নাম লক্ষণ প্রতিকার পাউডারী মিলডিউ এ রোগে পাতায় সাদা সাদা পাউডার দেখা যায় যা পাতা নষ্ট করে দেয়। ১. ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করে নিতে হবে। ২. রোগমুক্ত,গুনগতমান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে হবে। ৩. আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা মাটির নিচে পুঁতে রাখতে হবে। ৪. শস্য-পর্যায় অবলম্বন করতে হবে। ডাউনি মিলডিউ এর জন্য গাছের পাতা ধূসর হয়ে যায়। পাতায় সাদা পাউডার দেখা যায়। * শস্য-পর্যায়ঃ একই জমিতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের ধারাকে শস্য-পর্যায় বলে। ফসল সংগ্রহ/সংরক্ষণ/ফলন ফসল সংগ্রহ ফসল তোলার উপযোগী বৈশিষ্ট্য সংগ্রহের উপযোগী সময় কতদিন সময় লাগবে স্ত্রী ফুলের পরাগায়নের ১৫-২০ দিনের মধ্যে ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়। কচি ও অপুষ্ট অবস্হায় ৩ দিন পর পর সংগ্রহ করা যায়। ৪০-৪৫ দিন সংরক্ষণ পদ্ধতি তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা সংরক্ষণ সময় সকাল বা বিকালে ফসল উত্তোলন করে ঠান্ডা এবং ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। ৮-১২ ডিগ্রী সে. এবং ৮৫-৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা। ২-৩ সপ্তাহ ফলন   ফলন (একর প্রতি) প্রায় ৮০০০-১০০০০ কেজি।
Tuesday, 20 March 2012 | 7 hits
সেমি-অর্গানিক চাষাবাদ/শাক-সবজি চাষাবাদ
পরিচিতি ইংরেজি নাম : Ridge Gourd বৈজ্ঞানিক নাম : Luffa acutangula পরিবার : Cucurbitaceae উৎপত্তি : ভারতীয় উপমহাদেশ ঝিংগা বর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ। এর শিকড়সমূহ সরু এবং সুবিস্তৃত। কান্ড সরু, কোমল, খসখসে (scabrous)। কান্ডের প্রস্থচ্ছেদ পাঁচকোণী। পাতার খণ্ডায়ন (lobing) অপেক্ষাকৃত অগভীর, পাতা ফ্যাকাসে সবুজ এবং খসখসে। ঝিংগার ফুল একবাসি। ফুল হলুদ রঙের ও কিছুটা সুগন্ধময়। ঝিংগার ফল নলাকৃতির অথবা মুগুরাকৃতির (club shaped)। ফল শিরবিশিষ্ট (ridged), ফলের উপরিভাগ লোমহীন (glabrous)। বীজ কালো রঙের, চ্যাপ্টা ও উপরিভাগ মসৃণ। ঝিংগা অতি প্রাচীন ফসল। এটি প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঝিংগা বাংলাদেশের একটি সুস্বাদু জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন সবজি। ছবি জাত বারি জাতের বীজ এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। জলবায়ু ও মাটি এবং জমি তৈরি   জলবায়ু ও মাটি আবহাওয়া ও জলবায়ু আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা মাটির ধরন দীর্ঘ সময়ব্যাপী উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া ঝিংগা চাষের জন্য ভাল। প্রচুর সূর্যালোকযুক্ত এলাকা ঝিংগা চাষের জন্য ভাল। সুনিষ্কাশিত উচ্চ জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোঁ-আশ মাটিতে ঝিংগার ফলন ভাল হয়। জমি তৈরি • এসব ফসল চাষে সেচ ও পানি বের করে দেওয়ার জন্য সুবিধাযুক্ত এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। • একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ পরিহার করতে পারলে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রুব কমানো যাবে। • গাছের ব্যাপক শিকড় প্রণালীর যথাযথ বৃদ্ধির জন্য জমি এবং গর্ত ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। চারা উৎপাদন ও রোপণ পদ্ধতি বীজতলা তৈরি • ঝিংগা চাষের জন্য চারা নার্সারিতে পলিব্যাগে উৎপাদন করে নিতে হবে। এজন্য, আলো বাতাস স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় এমন জায়গায় ২০ থেকে ২৫ সেমি উঁচু বেড করে নিতে হবে। • বেডের উপর ৪×৫.২ মি আকৃতির ঘর তৈরি করে নিতে হবে। • ঘরের কিনারা বরাবর মাটি হতে ঘরের উচ্চতা হবে ০.৬ মি এবং মাটি হইতে ঘরের মধ্যভাগের উচ্চতা হবে ১.৭ মি। • ঘর তৈরির জন্য বাঁশ, বাঁশের কঞ্চি, ছাউনির জন্য প্লাস্টিক এবং এগুলো বাঁধার জন্য সুতলী বা দড়ি দরকার হবে। বীজ বপন • বীজ বপনের জন্য ৮×১০ সেমি বা এর থেকে কিছুটা বড় আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করা যায়। • প্রথমে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। • মাটিতে বীজ গজানো জন্য “জো” নিশ্চিত করে (মাটিতে “জো” না থাকলে পানি দিয়ে “জো” করে নিতে হবে) তা পলিব্যাগে ভরতে হবে। • প্রতিব্যাগে দুইটি করে বীজ বুনতে হবে। • বীজের আকারের দ্বিগুণ মাটির গভীরে বীজ পুতে দিতে হবে। বীজতলায় চারার পরিচর্যা • নার্সারিতে চারার প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। বেশি শীতে বীজ গজানোর সমস্যা হয়। এজন্য শীতকালে চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বীজ গজানোর আগ পর্যন্ত প্রতি রাতে প্লাস্টিক দিয়ে পলিব্যাগ ঢেকে রাখতে হবে এবং দিনে খোলা রাখতে হবে। • চারার প্রয়োজন অনুসারে পানি দিতে হবে। তবে সাবধান থাকতে হবে যাতে চারার গায়ে পানি না পড়ে। পলিব্যাগের মাটি চটা বাঁধলে তা ভেঙ্গে দিতে হবে। • ঝিংগার চারাগাছে ‘রেড পামকিন বিটল’ নামে এক ধরনের লালচে পোকার ব্যাপক আক্রমণ হয়। এটি দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজের সহজ অংকুরোদগম • ঝিংগার বীজের খোসা কিছুটা শক্ত থাকে। • সহজ অংকুরোদগমের জন্য পরিষ্কার পানিতে ১৫ থেকে ২০ ঘন্টা ভিজিয়ে অত:পর পলিব্যাগে বপন করতে হবে। বীজের পরিমাণ ঝিংগা চাষের জন্য শতাংশ জমি প্রতি ২.৫ গ্রাম পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হয়। বেড তৈরি এবং বেড থেকে বেডের দূরত্ব : বেডের উচ্চতা হবে ১৫ থেকে ২০ সেমি। বেডের প্রস্থ হবে ১.২ মি এবং লম্বা জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে সুবিধামত নিতে হবে। এভাবে পরপর বেড তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দুইট বেডের মাঝখানে ৬০ সেমি ব্যাসের সেচ নালা থাকবে এবং প্রতি দু’বেড পরপর ৩০ সেমি প্রশস্থ শুধু নিকাশ নালা থাকবে। মাদা তৈরি এবং বেডে মাদা হইতে মাদার দূরত্ব : মাদার ব্যাস ৫০ থেকে ৫৫ সেমি এবং তলদেশ ৪৫ থেকে ৫০ সেমি হবে। সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি : ঝিংগা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং অনেক লম্বা সময়ব্যাপী ফল দিয়ে থাকে। কাজেই ফসলের সফল চাষ করতে হলে গাছের জন্য পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। খাবার সংগ্রহের জন্য শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। সারের মাত্রা জৈবসার জমিতে যত বেশি ব্যবহার করা যায়, তত ভালো হয়। জৈবসারের জন্য যে সব জিনিসগুলো ব্যবহার করতে পারি সেগুলো হলো - ১. গোবর ২.খামারজাত সার ৩. কম্পোস্ট ৪. লতাপাতা ৫. খৈল ৬. ছাই প্রতি শতকের জন্য ৫০ থেকে ১শ কেজি পচাগোবর/খামারজাত সার/কম্পোস্ট বা যে কোন জৈবসার দিতে হবে। প্রতিশতকে ১০ থেকে ১৫ কেজি খৈল ব্যবহার করা যায়। প্রতিশতকে ৫ থেকে ৭ কেজি ছাই ব্যবহার করা যায়। তবে জৈবসারের মাত্রা হলো “যত বেশি তত ভালো”।          জমিতে ব্যবহারের জন্য গোবর ও খৈল প্রস্তুত করা পচা গোবর ও ৩/৫ দিন পচানো খৈল সরাসরি জমিতে দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তবে খৈল পুরো জমিতে না দিয়ে চারা রোপণের গর্তে দিলে লাভ বেশি হবে। খৈল প্রয়োগের আগে দেখতে হবে খৈল ভালোভাবে পচেছে কিনা। ঝাঁঝালো গন্ধ আছে কি না। গন্ধযুক্ত খৈল দিলে চারা মরে যাবে। মনে রাখতে হবে “কাঁচা গোবর বিষ - পচা গোবর সার”। জমিতে ব্যবহারের জন্য লতাপাতা প্রস্তুত করা লতাপাতা যেমন কচুরীপানা বা এ জাতীয় গাছগুলো প্রথমে শুকাতে হবে পরে গর্ত করে বা স্তুপ পদ্ধতি অবলম্বন করে পঁচিয়ে নিতে হবে। ভালোভাবে পঁচলেই কেবল জমিতে ব্যবহার করতে  হবে। কম পঁচানো জৈবসার মাটিতে দিলে মাটি বিষাক্ত হবে ও ফলনে ব্যাঘাত ঘটবে। জমিতে ব্যবহারের জন্য খামারজাত সার প্রস্তুত করা প্রথমে বড় একটি গর্ত করতে হবে। গর্তটির ২টি চেম্বার থাকবে। একটি চেম্বার ঘরের যাবতীয় আবর্জনা লতাপাতা তরকারির উচ্ছিষ্ট অংশ, ঘর ঝাড়ু দেয়া অংশ, ঘাস, ডিমের খোসা, মাছের কাটা, মাংসের হাড্ডি এমনকি বাচ্চাদের পায়খানা অর্থ্যাৎ চুল ও পলিথিন বাদ দিয়ে সব পচনশীল আবর্জনা প্রতিদিন জমা করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একমুঠ (৫০ গ্রাম) ইউরিয়া এবং একমুঠ (৫০ গ্রাম) টিএসপি জমাকৃত আবর্জনার মধ্যে ছিটিয়ে দিতে হবে। এত জৈব সারের পচনক্রিয়া দ্রুত হবে। চেম্বার উপর কাঠ, টিন, এডভেস্টর বা পাতার ছাউনি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এভাবে জমা করে রাখা আবর্জনা ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর পাশের চেম্বার নিয়ে যেতে হবে। নতুন চেম্বার আগের চেম্বারের আবর্জনা। দ্বিতীয় চেম্বারে ৩০ থেকে ৩৫ দিন আবর্জনা রাখার পর এ সব সার  যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়ে যাবে।  যে কোন জমিতে যে কোন ফসলের জন্য যত বেশি পরিমাণ পাওয়া যায় ব্যবহার করা যাবে। চারা রোপণ • চারার বয়স ১৫-১৬ দিন হলে তা মাঠে তৈরি গর্তে লাগাতে হবে। • চারাগুলো রোপণের আগের দিন বিকালে পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরের দিন বিকালে চারা রোপণ করতে হবে। মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলট-পালন, কোঁদাল দিয়ে এক কোপ দিয়ে চারা লাগানোর জন্য জায়গা করে দিতে হবে। • চারার পলিব্যাগের ভাঁজ বরাবর ব্লেড দিয়ে কেটে পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে চারাপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। চারা লাগানোর পানি দিতে হবে। পলিব্যাগ সরানোর সময় এবং চারা রোপণের সময় সাবধান থাকতে হবে যাতে মাটির দলা ভেঙ্গে চারার শিকড় ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। নতুবা শিকড়ের ক্ষতস্থান দিয়ে ঢলে পড়া রোগের (ফিউজারিয়াম উইল্ট) জীবাণু ঢুকবে এবং শিকড় ক্ষতিগ্রস্থ হলে গাছের বৃদ্ধি দেরিতে শুরু হবে। আন্তঃপরিচর্যা সেচ দেওয়া ঝিংগা গ্রীষ্মকালে চাষ করা হয়। গ্রীষ্মকালে কিছু বৃষ্টি হয় বলে তখন সবসময় পানি সেচের প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ সময় থেকে মে মাস পর্যন্ত খুব শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে। এ সময়ে বিশেষ করে ফুল ও ফল উৎপাদনকালে প্রয়োজন অনুসারে অথবা ৫ থেকে ৬ দিন পরপর পানি সেচের প্রয়োজন হয়। বাউনি দেওয়া ঝিংগার অধিক ফলন পেতে হলে অবশ্যই মাচায় চাষ করতে হবে। ঝিংগা মাটিতে চাষ করলে ফলের একদিক বিবর্ণ হয়ে বাজারমূল্য কমে যায়, ফলে পচন ধরে এবং প্রাকৃতিক পরাগায়ন কমে যায়। মালচিং সেচের পর জমিতে চটা বাঁধে ও গাছের শিকড়াঞ্চলে বাতাস চলাচল ব্যাহত হয়। কাজেই প্রত্যেক সেচের পর হালকা মালচ করে গাছের গোড়ার মাটির চটা ভেঙ্গে দিতে হবে। আগাছা দমন কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির ঘাসের ‘মোজাইক ভাইরাস’ রোগের আবাস স্থল। তাই চারা লাগানো থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত জমি সবসময়ই আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। এছাড়াও গাছের গোড়ায় আগাছা থাকলে তা খাদ্যোৎপাদান ও রস শোষণ করে বলে গাছে এসবের অভাব পড়ে। ফলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। বিশেষ পরিচর্যা শোষক বা অপসারণ : গাছের গোড়ার দিকে যে ছোট ছোট ডগা হয় তাকে শোষক শাখা বলা হয়। এগুলো গাছের ফলনে এবং যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই গাছের গোড়ার দিকে ৪০ থেকে ৪৫ সেমি পর্যন্ত ডগাগুলো ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে অপসারণ করতে হবে। ফল ধারণ বৃদ্ধিতে কৃত্রিম পরাগায়ন : ঝিংগার পরাগায়ন মৌমাছির দ্বারা সম্পন্ন হয়। প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে বেশি ফল ধরার জন্য হেক্টরপ্রতি তিনটি মৌমাছির কলোনী স্থাপন করা প্রয়োজন। এছাড়াও কৃত্রিম পরাগায়ন করে ঝিংগার ফলন শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। ঝিংগার ফুল বিকাল ৪ ঘটিকা থেকে সন্ধ্যার মধ্যে ফোটা শেষ হয়। এর পরাগায়ন ফুল ফোটার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং পরদিন সকালের অগ্রভাগে হয়। তাই ভাল ফল পেতে হলে কৃত্রিম পরাগায়ন ফুল ফোটার দিন সন্ধ্যার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য ফুল ফোটার পর একই জাতের পুরুষ ফুল ছিঁড়ে নিতে তার পাপড়ি অপসারণ করে পরাগধানী (যার মধ্যে পরাগরেনু থাকে) স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে আস্তে (যেটি গর্ভাশয়ের পিছনে পাপড়ির মাঝখানে থাকে) ঘষে দেয়া হয়। এই নিয়ম ঝিংগার মুক্ত পরাগায়িত জাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। স্ত্রী ফুল তথা ফলের সংখ্যা বৃদ্ধি : এ ফলের বীজ থেকে পরবর্তী ফসল করলে তাতে স্ত্রী ফুল তথা ফলের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং এর ফলে ফলনও বেড়ে যাবে। এতে জাতের বিশুদ্ধতাও রক্ষা পাবে।     পোকামাকড় ও রোগবালাই পোকামাকড় পোকার নাম লক্ষণ প্রতিকার মাছি পোকা ঝিংগার একটি অন্যতম ক্ষতিকারক পোকা ফলের মাছি পোকা। এ পোকার আক্রমণে ঝিংগার ফলন হ্রাস পেতে পারে। এই পোকা ঝিংগার মধ্যে প্রথমে ডিম পাড়ে, পরবর্তীতে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের ভিতরে খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। এ পোকার আক্রমণের ফলে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ ভাগ ফল নষ্ট হয়ে যায়। দুই ধাপে এ পোকা কার্যকরভাবে দমন করা যায়। ১. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ : মাছি পোকায় আক্রান্ত ফল দ্রুত পচে যায় এবং গাছ হতে মাটিতে ঝরে পড়ে। এই ফল কোনক্রমেই জমির আশেপাশে ফেলে রাখা ঠিক নয়। আক্রান্ত ফলসমূহ সংগ্রহ করে (যেহেতু এ পোকার কীড়া সমূহ মাটির ১০ থেকে ১২ সেমি গভীরে পুত্তুলিতে পরিণত হয়) কমপক্ষে ৩০ সেমি পরিমাণ গর্ত করে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে অথবা হাত বা পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হবে। ২. সেক্স ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদের যৌথ ব্যবহার : কিউলিওর নাম সেক্স ফেরোমন পানি ফাঁদের মাধ্যমে ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে পুরুষ মাছি পোকা আকৃষ্ট করে মাছি পোকা সমূহকে মেরে ফেলা যায়। ফাঁদ প্রতি এক মিলি পরিমাণ সেক্স ফেরোমন একখন্ড তুলার টুকরায় ভিজিয়ে পানি ফাঁদের প্লাস্টিক পাত্রের মুখ হতে ৩ থেকে ৪ সেমি নীচে একটি সরু তার দিয়ে স্থাপন করতে হবে। ফেরোমনের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ মাছি পোকা প্লাস্টিক পাত্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও সাবান পানিতে পড়ে আটকে মারা পড়ে। বিষটোপ ফাঁদে পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছি পোকা আকৃষ্ট হয় এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। একশত গ্রাম পাকা মিষ্টিকুমড়া কুচি কুচি করে কেটে তা থেতলিয়ে ০.২৫ গ্রাম মিপসিন ৭৫ পাউডার অথবা সেভিন ৮৫ পাউডার এবং ১০০ মিলি পানি মিশিয়ে ছোট একটি মাটির পাত্রে নিয়ে তিনটি খুঁটির সাহায্যে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে বিষটোপের পাত্রটি মাটি থেকে ০.৫ মিটার উঁচুতে থাকে। বিষটোপ তৈরির পর ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করে তা ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে তৈরি বিষটোপ ব্যবহার করতে হবে। সেক্স ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদ কুমড়া জাতীয় ফসলের জমিতে ১২ মিটার দূরে দূরে স্থাপন করতে হবে। পামকিন বিটল লাল ও নীল রংয়ের দুই প্রজাতির মধ্যে নীল পামকিন ঝিংগা ফসলের বেশি ক্ষতি করে। পামকিন বিটলের পূর্ণবয়স্ক পোকা চারা গাছের পাতায় ফুটো করে এবং পাতার কিনারা থেকে খাওয়া শুরু করে সম্পূর্ণ পাতা খেয়ে ফেলে। এই পোকা বয়স্ক গাছের শিরা উপশিরাগুলো রেখে পাতার সম্পূর্ণ সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। এ পোকা ফুল ও কচি ফলেও আক্রমণ করে। এদের কীড়া শিকড় বা মাটির নীচে থাকা কান্ড ছিদ্র করে ফেলে। তাই গাছ ঢলে পড়ে এবং পরিশেষে শুকিয়ে মরে যায়। অনেক সময় এরা চারা গাছ সম্পূর্ণ মেরে ফেলে বলে এসব ফসলের বীজ একাধিকবার বুনতে হয়। ১. চারা আক্রান্ত হলে হাত দিয়ে পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে। ২. ক্ষেত সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। ৩. চারা অবস্থায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত মশারির জাল দিয়ে চারাগুলো ঢেকে রাখলে এ পোকার আক্রমণ থেকে গাছ বেঁচে যায়। কাঁটালে পোকা বা এপিল্যাকনা বিটল এই পোকা পাতার শিরাগুরোর মাঝের অংশ খেয়ে ফেলে। মধ্য শিরা বাদে পাতার সমস্ত অংশ খেয়ে ঝাঝরা করে ফেলতে পারে। ফলের উপরি ভাগের কিছু অংশ খেয়ে ফেলতে পারে অথবা ছোট ছিদ্র করতে পারে। ১. পোকা সহ আক্রান্ত পাতা হাত বাছাই করে মেরে ফেলতে হবে। ২. নিমতেল ১০ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ৩. এক কেজি আধা ভাঙ্গা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি স্প্রে করতে হবে। জাব পোকা জাব পোকার আক্রমণে ঝিংগার বাড়ন্ত ডগা ও পাতা হলুদ হয়ে যায় ও গাছ সতেজতা হারিয়ে ফেলে। ফলন মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক জাব পোকা দলবদ্ধভাবে গাছের পাতার রস চুষে খায়। ফলে পাতা বিকৃত হয় যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও প্রায়শ নীচের দিকে কুঁকড়ানো দেখা যায়। জাব পোকা শরীরের পিছন দিকে অবস্থিত দুটি নল দিয়ে মধুর মত এক প্রকার রস নিসৃত করে। এই রস পাতা ও কান্ডে সুটিমোল্ড নামক এক প্রকার কালো রংয়ের ছত্রাক জন্মায়। এর ফলে গাছের সবুজ অংশ ঢেকে যায় এবং সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় জাব পোকার বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়। প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে এদের সংখ্যা কমে যায়। ১. প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাব পোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা যায়। ২. নিম বীজের দ্রবণে (১ কেজি পরিমাণ অর্ধভাঙ্গা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) বা সাবান গুলা পানি (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২ চা চামচ গুড়া সাবান মেশাতে হবে) স্প্রে করেও এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমানো যায়। ৩. লেডীবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া এবং সিরফিড ফ্লাই এর কীড়া জাব পোকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে দমন করে। সুতরাং উপরোক্ত বন্ধু পোকাসমূহ সংরক্ষণ করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়। রোগবালাই রোগের নাম লক্ষণ প্রতিকার ডাউনি মিলডিউ ঝিংগার পাতার নীচের দিকে হলুদ কৌণিক দাগ দেখা যায় এবং পাতার উপর দিকে রক্তাভ বীজগুটি বা স্পোর দেখা যায়। এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে ঝিংগার পাতা এবং গাছ ধ্বংস করে। ডাউনি মিলডিউ রোগ হলে গাছের পাতা ধূসর রং ধারণ করে, পাতায় সাদা সাদা পাউডার দেখা যায়। মোজাইক ভাইরাস এ রোগের কারণে গাছের পাতা সবুজ ও হলুদ রংয়ের মোজাইক ভাইরাস আকার ধারণ করে। পাতায় হলদে ছোপ দেখা যায় ও পাতা কুঁকড়ে যায় ফলে ফলন বহুলাংশে কমে যায়। ১. ভাইরাস দেখা মাত্র আক্রান্ত গাছ ধ্বংস করে ফেলতে হবে।     ফসল তোলা ও ফলন ফসল তোলা ভাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ২ থেকে ৩ মাস ব্যাপী ফল সংগ্রহ করা যায়। ফলের ভক্ষণযোগ্য পরিপক্কতা নিম্নরূপে যাচাই করা হয়- • ঝিংগার ফল পরাগায়নের ৮ থেকে ১০ দিন পর সংগ্রহের উপযোগী হয়। • ফল মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাবে। বীজ উৎপাদন বীজের জন্য ফল সংগ্রহ : বীজের জন্য জমির গাছের সতেজতা, ফলন ক্ষমতা এবং সুস্থতা দেখে কয়েকটি গাছ নির্বাচন করে একই গাছের পুরুষ ফুল দিয়ে একই গাছের স্ত্রী ফুল অথবা এবই জাতের এক গাছের পুরুষ ফুল দিয়ে অন্য গাছের স্ত্রী ফুল পরাগায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে স্ত্রী ফুল ফোটার আগেই পেপার ব্যাগ দ্বারা বেঁধে রাখতে হবে যাতে অন্য জাতের পুরুষ ফুলের রেনু দ্বারা পরাগায়িত হতে না পারে। স্ত্রী ফুল পরাগায়িত করে আবার ব্যাগ দ্বারা ৩ থেকে ৪ দিন বেঁধে রাখা ভাল। বীজের জন্য ফলের পরিপক্কতা সনাক্তকরণ : বীজের জন্য অবশ্যই পরিপক্ক ফল সংগ্রহ করতে হবে। ফলের পরিপক্কতা বুঝার একটি উপায় হলো- ফল পাকলে শুকিয়ে যাবে এবং নাড়লে ভিতরে বীজের শব্দ পাওয়া যাবে। বীজের ফলন : হেক্টরপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ কেজি বা শতাংশ প্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম বীজ পাওয়া সম্ভব। ফলন ভাল জাত উর্বর মাটিতে ভালোভাবে চাষ করতে পারলে হেক্টরপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টন (৪০ থেকে ৬০ কেজি/শতাংশ) ফলন পাওয়া সম্ভব।
Tuesday, 20 March 2012 | 14 hits

<< Start < Prev 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 Next > End >>
Page 1 of 32


Powered by AlphaContent 4.0.10 © 2005-2014 - All rights reserved